সার পাচারের অভিযোগে জেলার পাঁচটি উপজেলায় অভিযান চালিয়ে আটটি চালানের মোট ৩ হাজার ৫৪ বস্তা সার আটক করা হয়।

ভোলা জেলার পাঁচটি উপজেলার নদীপথ, ঘাট ও বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে গত ছয় মাসে পাচারের অভিযোগে সারের আটটি চালান জব্দ করেছে পুলিশ ও দক্ষিণাঞ্চলের কোস্টগার্ড। এর মধ্যে সার পাচারের চারটি অভিযোগ তদন্তে প্রমাণ করা যায়নি।

গত ৬ মার্চ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভোলা সদর উপজেলা, চরফ্যাশন, তজুমদ্দিন, মনপুরা ও লালমোহন উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযানে আটটি চালানের মোট ৩ হাজার ৫৪ বস্তা সার জব্দ করা হয় (প্রতি বস্তায় ৫০ কেজি সার)। এসব ঘটনায় আটক করা হয় ১২ জনকে। আর সার পাচারের অভিযোগে মামলা হয়েছে আটটি। জব্দ করা আটটি চালানের মধ্যে ভোলা সদরে একটি, চরফ্যাশনে তিনটি, তজুমদ্দিনে একটি, মনপুরায় দুটি ও লালমোহনে একটি রয়েছে।

তদন্তে সার পাচারের অভিযোগ প্রমাণ না পাওয়ায় ভোলা সদরের একটি ও চরফ্যাশনের একটি চালানের ১ হাজার ৫৯৫ বস্তা সার প্রকৃত মালিকদের ফেরত দিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ। আর ফেরতের অপেক্ষায় আছে তজুমদ্দিন ও লালমোহনের দুটি চালানের ১৯১ বস্তা সার। এখনো জব্দ আছে মনপুরার একটি ও চরফ্যাশনের দুটি চালানের মোট ১ হাজার ২৬৮ বস্তা সার।

সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, আটটি চালানের মধ্যে চরফ্যাশন উপজেলার দুটি চালান জব্দের ঘটনায় করা মামলার তদন্ত চলছে। মনপুরা উপজেলার একটি ঘটনার তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। অপর একটি মামলার তদন্ত চলছে। বাকি চারটি চালানের মধ্যে ভোলার একটি ও চরফ্যাশনের একটি চালানের সার ফেরত দিয়েছে প্রশাসন। তজুমদ্দিন ও লালমোহনের একটি করে চালানের সার ফেরতের প্রক্রিয়া চলমান।

কৃষক সংগঠন, কৃষি বিভাগ, সার পরিবেশক ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সার সমস্যার মূল জায়গা শুধু পাচার নয়, বরং পরিবেশকদের অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি, ক্যাশ ম্যামো (রশিদ) না দেওয়া, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক বিক্রয়কেন্দ্র না থাকা এবং বাজার তদারকির দুর্বলতা দায়ী।

জেলার সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক শামীম রহমান। গতকাল সোমবার তিনি মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, সার জব্দ করার ক্ষেত্রে প্রথমে দেখা হয় অনুমোদিত পরিবেশকের কাছ থেকে সার সরবরাহ করা হয়েছে কি না এবং পরিবহনের সময় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বা রসিদ আছে কি না। পরে প্রকৃত মালিক বা পরিবেশক বৈধ কাগজপত্র ও ক্রয়ের প্রমাণ দেখাতে পারলে সার ছেড়ে দেওয়া হয়। নতুবা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

মনপুরায় পাচার হচ্ছিল সার

মনপুরা উপজেলার উত্তর সাকুচিয়া ইউনিয়নের লতাখালী ঘাট-সংলগ্ন এলাকা দিয়ে সার পাচার হচ্ছিল, এমন খবর পেয়ে গত ৪ জুলাই রাতে যৌথ অভিযান চালিয়ে একটি মাছ ধরার নৌকা থেকে ২০৭ বস্তা সার (ডিএপি ৯৪ বস্তা, ইউরিয়া ৫৫ বস্তা এবং এমওপি ৫৮ বস্তা) জব্দ করে কোস্টগার্ড ও পুলিশ। এ ঘটনায় এক তরুণকে আটক করা হয়।

এ ছাড়া ১৩ আগস্ট রাতে মনপুরা-হাতিয়া সীমান্ত এলাকা থেকে নদীপথে সার পাচারের সময় ৭৬০ বস্তা সার জব্দ করা হয়। এ সময় আটক করা হয় আরও চারজনকে।

মনপুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাজহারুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, কোস্টগার্ড ও পুলিশের অভিযানে জব্দ হওয়া সারের চালান মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া হচ্ছিল বলে তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে। একটি মামলায় ইতিমধ্যে অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।

ভোলায় জব্দ করা সার ফেরত

ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা ফেরিঘাটে গত ৬ মার্চ রাতে অভিযান চালিয়ে চারটি ট্রাকে থাকা ১ হাজার ৪২০ বস্তা সরকারি টিএসপি সার জব্দ করে পুলিশ। আটক করা হয় একজনকে।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, তদন্তে জানা যায়, চালানটি বৈধ ছিল। পরে ওই সারের বৈধ কাগজ দেখিয়ে বরগুনার দুই পরিবেশক সারের বস্তাগুলো নিয়ে যান।

ভোলার বাফার (সরকারি সার গুদাম) গুদামের ইনচার্জ মাসুদ পারভেজ মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন বৈধ চালানধারীদের যেন অযথা হয়রানি না করেন, এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের সভাপতি শাহাবউদ্দিন ফরাজী মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, সারের অতিরিক্ত দাম নেওয়ার বিষয়টি গোপন রাখতে অনেক ডিলার কৃষকদের ক্যাশ ম্যামো দেন না। এতে সার নিয়ে যাওয়ার সময় কৃষকেরা পাচারকারী সন্দেহে ধরা পড়েন। এক কেজি সার বিক্রি হলেও ক্যাশ ম্যামো দেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে।

তজুমদ্দিনে জব্দ করা সার ফেরতের অপেক্ষায়

তজুমদ্দিন উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা বাজারঘাট এলাকায় অভিযান চালিয়ে গত ৬ সেপ্টেম্বর ১৬০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করে কোস্টগার্ড। তজুমদ্দিনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউএনও মো. বনি আমিন জানান, কোস্টগার্ড এটিকে পাচারের ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করলেও উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের তদন্তে দেখা যায়, কয়েকজন কৃষক ও খুচরা বিক্রেতা বৈধভাবে পরিবেশকের কাছ থেকে সার কিনে চরাঞ্চলে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁদের কাছে পরে ক্যাশ ম্যামোও পাওয়া যায়। এসব সার প্রকৃত মালিকের কাছে ফেরত দেওয়া হবে।

চরফ্যাশনে ১৭৫ বস্তা সার ফেরত, জব্দ ৩০১

চরফ্যাশন উপজেলার দক্ষিণ আইচা থানার চর কচ্ছপিয়া ঘাট থেকে গত ২৪ আগস্ট ১৭৫ বস্তা সার জব্দ করে কোস্টগার্ড। চরফ্যাশন উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা রুমানা আফরোজ জানান, সারের ক্রেতা বৈধ কাগজপত্র দেখানোর পরে সার ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

গত ১২ আগস্ট রাতে চরফ্যাশন উপজেলার বেতুয়া মেঘনা নদীর পাড় থেকে মিয়ানমারে পাচারের চেষ্টার অভিযোগে ২৯৩ বস্তা সার জব্দ করে পুলিশ। আটক করা হয় চারজনকে।

চরফ্যাশন থানার ওসি মাহমুদ আল-ফরিদ ভূঁইয়া বলেন, প্রাথমিক তদন্তে সারের বস্তাগুলো মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া হচ্ছিল বলে ধারণা করা হয়। তবে প্রকৃত মালিক বা বৈধ পরিবেশকের পরিচয় পাওয়া যায়নি।

চরফ্যাশনের সীমান্তবর্তী চর নিজাম এলাকা থেকে পাচারের অভিযোগে গত ৫ জুলাই রাতে ৮ বস্তা সার জব্দ করে চরফ্যাশনের দক্ষিণ আইচা থানার পুলিশ। এ ঘটনায় দুজনকে আটক করা হয়।

লালমোহনে সার ফেরত প্রক্রিয়াধীন

লালমোহন উপজেলার গাইট্টার খাল এলাকা থেকে গত ২০ জুন পাচারের অভিযোগে ৩১ বস্তা ইউরিয়া সার ও একটি ট্রলার জব্দ করে উপজেলা প্রশাসন। তদন্তে অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ায় এসব সার ফেরতের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন।

লালমোহন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সিফাত বিন সাদেক মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, একাধিক সংস্থা তদন্ত করে প্রতিবেদন জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির কাছে জমা দেয়। সেই কমিটি সব প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, জব্দ হওয়া সার পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছিল, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

জেলায় সারের সার্বিক অবস্থা

ভোলার বাফার ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) গুদাম থেকে শুধু ভোলা জেলার জন্য নয়, বরিশাল বিভাগের আরও পাঁচটি জেলার জন্য নন-ইউরিয়া সার সরবরাহ করা হয়। সেখান থেকে অনুমোদিত সার পরিবেশকেরা (ডিলার) বরাদ্দ অনুযায়ী সার উত্তোলন করেন। অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো সার পরিবেশক নিজেরা সরাসরি সার উত্তোলন না করে অনুমোদনের কাগজ বিক্রি করে দেন। এই অনুমোদনের কাগজ যাঁর কাছে থাকে, তিনিই গুদাম থেকে সার উত্তোলন করতে পারেন। এ কাগজ দুভাবে বিক্রি হয়। একটি গুদামে আসার আগে, আরেকটা গুদামে আসার পরে। এভাবে একজনের সার অন্যজন উত্তোলনের কারণে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। এ সুযোগে সারের ঘাটতি দেখিয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করছেন পরিবেশকেরা। বেশি দামে সার বিক্রির ক্যাশ মেমো না দেওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতা পথে বিপদে পড়ছেন।পাচারের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা না গেলে ভোলার নদীপথে সার জব্দের ঘটনা চলতেই থাকবে। সেই সঙ্গে সার পাচার বা বৈধ পরিবহনের জটিলতা শেষ হবে না।

পাচারের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা না গেলে ভোলার নদীপথে সার জব্দের ঘটনা চলতেই থাকবে। সেই সঙ্গে সার পাচার বা বৈধ পরিবহনের জটিলতা শেষ হবে না।

এ বিষয়ে সার পরিবেশক, ভোলা জেলা সার ডিলার ও মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, কেউ বেশি দামে সার বিক্রি করছেন না, এটা প্রমাণ করার জন্য ক্যাশ মেমো দেওয়া জরুরি। ভবিষ্যতে তাঁরা ক্যাশ মোমো দেওয়া ও ক্রেতার সঙ্গে রাখা নিশ্চিত করবেন। তিনি আরও বলেন, যদি সত্যিই সংঘবদ্ধ পাচার চক্র সক্রিয় থাকে, তাহলে অভিযানে বারবার কৃষকশ্রমিক, মাঝি বা ছোট ব্যবসায়ী ধরা পড়লেও মূল হোতারা কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে?

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা যায়, মিয়ানমারে সারের উচ্চমূল্য পাচার চক্রকে সক্রিয় করে তুলেছে। মিয়ানমারে ইউরিয়া ও ডিএপি সারের দাম বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে পাচারের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভোলা জেলা শাখার সভাপতি মো. সুলাইমান বলেন, পাচারের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা না গেলে ভোলার নদীপথে সার জব্দের ঘটনা চলতেই থাকবে। সেই সঙ্গে সার পাচার বা বৈধ পরিবহনের জটিলতা শেষ হবে না।