দৈনন্দিন জীবনে কিংবা পড়াশোনার ক্ষেত্রে অনেক সময় আমরা অনেক কিছু মনে রাখতে পারি না। এই সমস্যাটি কেবল বর্তমান সময়ের নয়, বরং এটি মানব প্রকৃতির একটি সহজাত অংশ।

তবে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এই ‘ভুলে যাওয়া’ বা স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার সুনির্দিষ্ট আমলি নির্দেশনা রয়েছে।

স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া অন্যতম প্রধান কারণ পাপে লিপ্ত থাকা বা আল্লাহর অবাধ্যতা করা। ইসলামি স্কলারদের মতে, জ্ঞান হলো একটি নুর বা আলো, যা আল্লাহ কেবল পবিত্র হৃদয়েই দান করেন। পাপের অন্ধকার হৃদয়ে প্রবেশ করলে জ্ঞানের আলো নিভে যায়।

ইমাম শাফেয়ি (রহ.) তাঁর শিক্ষক ইমাম ওয়াকি-এর কাছে একবার তাঁর স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার অভিযোগ করেছিলেন। এর জবাবে শিক্ষক তাঁকে পাপ ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

ইমাম শাফেয়ি এ নিয়ে তাঁর বিখ্যাত কবিতাটি রচনা করেন, “আমি ওয়াকিকে আমার স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার কথা জানালাম, তিনি আমাকে গুনাহ পরিত্যাগের নসিহত করলেন। বললেন, জেনে রাখো—ইলম বা জ্ঞান হলো একটি নুর, আর আল্লাহর নুর কোনো পাপাচারীকে দেওয়া হয় না।” (দিওয়ানুল ইমাম শাফেয়ি, পৃষ্ঠা: ৫৪, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০৪)

একই মূলনীতি ব্যক্ত করেছিলেন ইমাম মালিক (রহ.)। যখন তরুণ ইমাম শাফেয়ি তাঁর কাছে শিক্ষা নিতে বসলেন, তাঁর প্রখর মেধা দেখে ইমাম মালিক বলেছিলেন, “আমি দেখছি আল্লাহ তোমার হৃদয়ে একটি আলো দান করেছেন। সাবধান, পাপে জড়িয়ে তুমি এই আলো নিভিয়ে দিও না।” (ইবনুল কাইয়িম, আল-জাওয়াবুল কাফি, ১/৫২, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০৫)

পবিত্র কোরআনেও বলা হয়েছে যে, মানুষের ওপর যেসব বিপদ আসে, তা মূলত তাদের নিজেদের কর্মফল। (সুরা শুরা, আয়াত: ৩০)

তাই গিবত, চোগলখুরি, নামাজে অবহেলা, পিতা-মাতার অবাধ্যতা, সুদি কারবার এবং মিথ্যা বলার মতো পাপগুলো স্মৃতিশক্তি ও মেধার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

বিস্মৃতির আরেকটি প্রচ্ছন্ন কারণ হলো অসৎ সঙ্গ। যারা সবসময় অনর্থক কথা, সমালোচনা এবং পাপাচার নিয়ে মেতে থাকে, তাদের সান্নিধ্য মানুষের অন্তরকে কঠিন করে দেয় এবং অর্জিত জ্ঞান ভুলিয়ে দেয়।

ইসলামে ভালো বন্ধু নির্বাচনের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। নেককার ও জ্ঞানীদের সাহচর্য মানুষের স্মৃতিশক্তিকে শানিত করে এবং আল্লাহর ভয় হৃদয়ে জাগ্রত রাখে। আবু মুসা আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, “সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ হলো কস্তুরী বহনকারী ও কামারের হাপরের মতো…” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫৩৪)

মুমিনের প্রথম হাতিয়ার হলো দোয়া। স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি এবং উপকারী জ্ঞান অর্জনের জন্য বিশেষভাবে কিছু দোয়ার কথা বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে।

১. উচ্চারণ: রব্বী যিদনী ইলমা। অর্থ: “হে আমার প্রতিপালক, আমাকে জ্ঞানে সমৃদ্ধ করুন।” (সুরা তোয়াহা, আয়াত: ১১৪)

২. রব্বিশ রহ্‌লী সদ্‌রী ওয়াইস্‌সিরলী আমরী, ওয়াহলুল উক্‌দাতাম মিল্‌–লিসানী ইয়াফকহূ কওলী। অর্থ: “হে আমার পালনকর্তা, আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন এবং আমার কাজ সহজ করে দিন। আর আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দিন, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।” (সুরা তোয়াহা, আয়াত: ২৫-২৮)

৩. রাসুলুল্লাহ (সা.) সবসময় উপকারী জ্ঞানের জন্য দোয়া করতেন। তিনি বলতেন, “(উচ্চারণ) আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা ইল্‌মান নাফিয়া।” (অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান প্রার্থনা করছি।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৯২৫)

দোয়ার পাশাপাশি কিছু বিশেষ সময়ের প্রতি খেয়াল রাখা প্রয়োজন যখন মহান আল্লাহ বান্দার প্রার্থনা দ্রুত কবুল করেন।

সিজদারত অবস্থায়, নামাজের শেষ বৈঠকে (আত্তাহিয়্যাতু পড়ার পর), রাতের শেষ প্রহরে, আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ে এবং জুমার দিনের বিশেষ মুহূর্তে (বিশেষ করে আসরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত) দোয়া করলে তা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “বান্দা সিজদারত অবস্থায় তার প্রতিপালকের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয়। তাই তোমরা (সিজদায়) অধিক পরিমাণে দোয়া করো।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮২)

পরিশেষে বলা যায়, ভুলে যাওয়ার রোগ থেকে মুক্তি এবং প্রখর স্মৃতিশক্তি অর্জন কেবল কোনো মন্ত্র বা নির্দিষ্ট শব্দের ওপর নির্ভরশীল নয়। এটি একটি সামগ্রিক আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া। এর জন্য একদিকে যেমন মহান আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে দোয়া করতে হবে, অন্যদিকে নিজের জীবনকে পাপাচারমুক্ত ও পবিত্র রাখতে হবে।

আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জিত হলে আল্লাহ বান্দাকে এমন এক দূরদৃষ্টি ও জ্ঞান দান করেন, যা তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।