নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. আজমুল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় তার বাবা মো. কুতুবউদ্দিন হরিণটানা থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। তবে মামলার এজাহারে পরিবারের প্রধান অভিযোগকারী মেহেদী হাসানের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

কুতুবউদ্দিন জানান, এসএসসি পাস করার পর আজমুল একাধিক ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিলেও সফল হননি। ওই সময়ে মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী মেহেদীর সাথে তার পরিচয় হয়। চার বছর পর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেখিয়ে মেহেদী ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার চুক্তি করেন বলে অভিযোগ বাবার। তিনি আরও দাবি করেন, বিষয়টি কাউকে জানালে আজমুলকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল।

"মেহেদী বলেছিল, চার বছর পর সার্টিফিকেট দিয়ে দেবে। এ নিয়ে এক লাখ ২০ হাজার টাকার চুক্তি হয়। কাউকে জানালে মেরে ফেলবে বলেছিল। আমার ছেলে আমাকে বলেছিল সে চান্স পেয়েছে। ছেলেকে বিশ্বাস করে ভর্তি বাবদ টাকা দিই। পরে জানতে পারি, সে আসলে চান্স পায়নি," বলেন কুতুবউদ্দিন।

পরে পরিবারের সিদ্ধান্তে আজমুলকে নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। এই খবর জানতে পেরে শুক্রবার মেহেদী তাকে ডেকে নেন। কুতুবউদ্দিনের বক্তব্য অনুযায়ী, দুপুর ১২টার দিকে ছেলে ফোন করে ৫৮ হাজার টাকা পাঠাতে বলে। বাবা জানান, কাছে এত টাকা না থাকায় ২৩ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিলে মেহেদী তা গ্রহণ করেন এবং জলদি আসতে বলেন। এরপরই আজমুলকে নিয়ে যাওয়া হয় এবং হত্যা করা হয় বলে পরিবারের অভিযোগ।

"মেহেদীকে গ্রেপ্তার করা গেলে ঘটনার প্রকৃত রহস্য বের হবে। তার সঙ্গে আর কেউ জড়িত থাকতে পারে," যোগ করেন তিনি। মামলার এজাহার দায়েরের সময় মেহেদীর নাম জানা ছিল না উল্লেখ করে তিনি বলেন, "ছেলে যে মেসে থাকত, সেখানে আমি কখনো যাইনি। শুক্রবার যখন টাকা চাওয়া হয়, তখনও আমি জানতাম না যে ওই ব্যক্তির নাম মেহেদী।"

অন্যদিকে, মেসের ছাদ থেকে আজমুল পড়ে মারা যাওয়ার ঘটনায় বিভিন্ন পক্ষ থেকে বিপরীত বক্তব্য পাওয়া গেছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন সাবেক শিক্ষার্থী দাবি করেন, চুরির অভিযোগে আজমুলকে আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল। তারা বলেন, আজমুল স্বীকার করেছিলেন যে সে শার্ট, প্যান্ট, গেঞ্জি, জুতা ও টাকা চুরি করেছে।

একজন শিক্ষার্থী রিফাত জানান, প্রথমে লাউডস্পিকারে আজমুলকে তার বাবার সাথে কথা বলতে বলা হয়। সে বাবাকে জানায় চুরির সময় ধরা পড়েছে। পরে ফোনটি নেওয়ার পর রিফাত আজমুলের বাবাকে জানান, "আপনার ছেলে এই কাজ করছে, আপনার আসা উচিত। কালকে এসে একটা ব্যবস্থা করেন। ওকে তো আর এখানে রাখা যাবে না।" তাদের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে আজমুল ছাদের কার্নিশের দিকে গিয়ে নিচে লাফ দেয়। বৃষ্টির পানি জমে থাকায় জায়গাটি পিচ্ছিল ছিল। লাফ দেওয়ার পর তাদের আর ধরার সুযোগ হয়নি। পরে রাতে তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

তবে মেসের অন্য শিক্ষার্থীদের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা দাবি করেন, চুরির চাদর তুলে আজমুলকে ছাদে নিয়ে চড়-থাপ্পড় ও মারধর করা হয়। এমনকি তার চুলও কেটে দেওয়া হয়। নির্যাতনের একপর্যায়ে আজমুল ছাদ থেকে নিচে পড়ে যান। শামীম নামের আরেক শিক্ষার্থী জানান, শুরুতে ছাদে ১০-১২ জন থাকলেও পরে আরও অনেকে আসে। জিজ্ঞাসাবাদের নামে মারধর ও চুল কেটে দেওয়ার পর একপর্যায়ে আজমুল উঠে দাঁড়িয়ে ছাদ থেকে লাফ দেন।

টাকা দাবির অভিযোগ অস্বীকার করে এক অভিযুক্ত শিক্ষার্থী বলেন, "আমাদের কেউ টাকা দাবি করবে—এটা অসম্ভব। আমাদের পরিকল্পনা ছিল তাকে পুলিশে দেওয়ার। ঘটনার সময় ছাদে ১৫-২০ জন ছিল। সে লাফ দেওয়ার পর সবাই হতবিহ্বল হয়ে পড়ে।"

নিহতের পরিবারের দাবি, চুরির ক্ষতিপূরণ হিসেবে আজমুলকে আটকে রেখে ১ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল। টাকা চাওয়ার পরপরই সংশ্লিষ্ট ফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে পুলিশ এখনও এই অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি।

ঘটনার পর ওই মেসের ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ তলার কয়েকটি কক্ষ তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। ভবনের তত্ত্বাবধায়ক আকিবুর হোসেন জানান, ঘটনার পর থেকেই বাসিন্দারা কেউ সেখানে নেই। বাড়ির মালিক সরোয়ার হোসেন চট্টগ্রামে চাকরি করায় বর্তমানে বাড়িটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছেন গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মেহেদী হাসান।

মেসের বাবুর্চি ফাতেমা বেগম বলেন, ঘটনার সূত্রপাত খাবার নিয়ে। এর আগেও মেস থেকে জিনিসপত্র হারানোর বিষয় নিয়ে আজমুলের ওপর কয়েকজনের ক্ষোভ ছিল। তা নিয়ে বিরোধের একপর্যায়ে তাকে মারধর করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দা আবু বকর জানান, শুক্রবার রাত পৌনে ১টার দিকে বিকট শব্দ শুনে গলি বের হয়ে একজনকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে মেসের কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

মামলার এজাহারে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থীসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২০-২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারভুক্ত চার আসামি হলেন: ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের মো. রবিন ও মো. মুবিন, গণিত ডিসিপ্লিনের মো. সাগর এবং এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের মো. ওবায়দুল।

হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইকবাল হোসেন বলেন, এজাহারভুক্ত আসামিদের পাশাপাসাশি ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। "আজমুলকে কীভাবে মারধর করা হয়েছে, ছাদ থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলা হয়েছে নাকি অন্য কীভাবে পড়েছে—সবই তদন্ত করা হচ্ছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও আলামত বিশ্লেষণ করে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও জড়িতদের শনাক্ত করা হবে।"

পরিবারের এসব অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য জানতে মেহেদী হাসানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। পুলিশ জানিয়েছে, পরিবারের অভিযোগসহ ঘটনার সব দিক তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।