পড়তে বসেছেন বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ করছেন, পাশে বাজছে পছন্দের গান। অনেকের কাছে গান ছাড়া দীর্ঘ সময় পড়াশোনা বা কাজ করা কঠিন। আবার কেউ গান চালু করলেই বই বা কাজ থেকে মন সরে যায়। তাহলে আসলে কোনটি ঠিক? কাজ বা পড়ার সময় গান শুনলে কি সত্যিই মনোযোগ বাড়ে?

বিজ্ঞানীদের গবেষণায় এর সরল কোনো উত্তর নেই। গান কখনো মন ভালো রাখতে, একঘেয়েমি কমাতে বা কাজে আগ্রহ ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। আবার বিশেষ করে কঠিন কাজ, পড়া বা লেখার সময় গানই মনোযোগের জন্য বাড়তি বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। এর প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করে কাজের ধরন, গানের ধরন এবং ব্যক্তির নিজের অভ্যাসের ওপর।

গান শুনলে মনোযোগ বাড়ে, এমন ধারণা কেন?

গান মস্তিষ্কে শুধু শব্দ হিসেবে কাজ করে না। এটি মানুষের মেজাজ, উত্তেজনার মাত্রা ও আগ্রহের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। একঘেয়ে বা দীর্ঘ সময়ের কাজের ক্ষেত্রে পছন্দের গান বিরক্তি কমিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিতে পারে।

২০২৫ সালের একটি গবেষণায়ও দেখা হয়েছে, পটভূমির সংগীত কীভাবে মনোযোগ, একঘেয়েমি, কাজের প্রতি আগ্রহ এবং মানসিক চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। গবেষণার ফল থেকে বোঝা যায়, সংগীতের প্রভাব ব্যক্তি ও কাজের পরিস্থিতি অনুযায়ী বদলাতে পারে।

অর্থাৎ গান শুনে আপনার কাজ করতে ভালো লাগছে মানেই যে আপনার তথ্য মনে রাখার ক্ষমতা একই সঙ্গে বেড়ে যাচ্ছে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

পড়াশোনার সময় গান কি ক্ষতি করতে পারে?

বিশেষ করে পড়া, লেখা বা মুখস্থ করার মতো কাজে গানের কথা মনোযোগে বাধা দিতে পারে। কারণ তখন মস্তিষ্ককে একই সঙ্গে লিখিত ভাষা এবং গানের শব্দ প্রক্রিয়া করতে হয়।

২০২৩ সালের একটি গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন জ্ঞানভিত্তিক কাজ করানো হয়। সেখানে দেখা যায়, গানের কথা থাকা সংগীত মৌখিক ও দৃশ্যগত স্মৃতি এবং পড়ার বোধগম্যতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে যন্ত্রসংগীতের ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে ক্ষতি বা উপকার কোনোটিই নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায়নি।

আরেকটি ২০২৪ সালের গবেষণায়ও দেখা গেছে, গানের কথা সম্বলিত পপ সংগীত পড়া বুঝতে পারার ক্ষমতা কমাতে পারে। বিশেষ করে যে ভাষায় পড়া হচ্ছে, সেই ভাষায় গান থাকলে বিভ্রান্তি বেশি হতে পারে।

কঠিন কাজের সময় নীরবতা কেন ভালো হতে পারে?

আপনি যদি জটিল কোনো বিষয় পড়েন, নতুন কিছু শেখেন, গুরুত্বপূর্ণ লেখা তৈরি করেন বা গভীরভাবে চিন্তা করতে হয় এমন কাজ করেন, তখন মস্তিষ্কের মনোযোগের বড় অংশ কাজটির জন্য প্রয়োজন হয়।

এই ধরনের পরিস্থিতিতে গান বাড়তি শব্দ হিসেবে কাজ করতে পারে। ২০২১ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ কঠিন জ্ঞানভিত্তিক কাজ করার সময় তুলনামূলক কম পটভূমির সংগীত ব্যবহার করেন। গবেষণাটি একই সঙ্গে দেখিয়েছে, গান ও জ্ঞানভিত্তিক কর্মক্ষমতার সম্পর্ক ব্যক্তি ও কাজের ধরন অনুযায়ী বেশ ভিন্ন হতে পারে।

তাই পরীক্ষার আগে কঠিন অধ্যায় পড়ার সময় যে গান আপনাকে উৎসাহ দেয়, সেটিই হয়তো মনোযোগ ধরে রাখার বদলে বাধা তৈরি করতে পারে।

তাহলে যন্ত্রসংগীত কি ভালো?

অনেকে মনে করেন গানের কথা না থাকলে গান শুনে পড়াশোনা করা নিরাপদ। এটি কিছু ক্ষেত্রে সত্যি হতে পারে, তবে সবার জন্য একই ফল হবে এমন নয়।

২০২৩ সালের গবেষণায় যন্ত্রসংগীত অংশগ্রহণকারীদের জ্ঞানভিত্তিক কর্মক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য ক্ষতি বা উন্নতি কোনোটিই নিশ্চিতভাবে দেখায়নি। অর্থাৎ যন্ত্রসংগীত অন্তত গানের কথা আছে এমন গানের তুলনায় কিছু কাজে কম বিভ্রান্তিকর হতে পারে, কিন্তু এটিকে মনোযোগ বাড়ানোর নিশ্চিত উপায় বলা যায় না।

যারা গান শুনতে অভ্যস্ত, তাদের ক্ষেত্রে পটভূমির সংগীতের প্রভাব অন্যদের তুলনায় কিছুটা আলাদা হতে পারে। ২০২৪ সালের গবেষণাতেও নিয়মিত গান শুনে পড়ার অভ্যাস থাকা শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে গানের কথা আছে এমন গানের নেতিবাচক প্রভাব তুলনামূলক কম দেখা গেছে।

কোন কাজে গান শুনতে পারেন?

সব ধরনের কাজের জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। যেমন, ঘর গোছানো, হাঁটা, নিয়মিত অফিসের কিছু কাজ বা অপেক্ষাকৃত সহজ ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের সময় গান একঘেয়েমি কমাতে পারে।

অন্যদিকে নতুন বিষয় শেখা, জটিল গণিত করা, বই পড়া, লেখা বা মুখস্থ করার মতো কাজে নীরব পরিবেশ অনেকের জন্য বেশি কার্যকর হতে পারে।

২০২৪ সালের একটি সুশৃঙ্খল পর্যালোচনাতেও সংগীত ও অন্যান্য শ্রবণীয় উদ্দীপনার জ্ঞানভিত্তিক কর্মক্ষমতা এবং মনোযোগের ওপর প্রভাবকে মিশ্র বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ গবেষণাগুলো থেকে সবার জন্য একটিমাত্র নিয়ম তৈরি করা যায় না।

পছন্দের গানও কি সমস্যা করতে পারে?

হ্যাঁ, পারে। পছন্দের গান শুনলে মন ভালো হতে পারে, কিন্তু সেই গান যদি খুব পরিচিত হয়, বিশেষ করে আপনি যদি গানের সঙ্গে গাইতে শুরু করেন, তাহলে কাজ থেকে মন সরে যেতে পারে।

একই কারণে এমন গান, যার কথা আপনি খুব ভালোভাবে জানেন, পড়াশোনার সময় বেশি বিভ্রান্তিকর হতে পারে। গবেষণায় গানের কথা আছে এমন সংগীতের এই ধরনের বিভ্রান্তির প্রমাণ পাওয়া গেছে।

গান শুনে কাজ করার সহজ নিয়ম

গান শুনতে ভালো লাগলে একেবারে বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। বরং কাজ অনুযায়ী ব্যবহার করতে পারেন।

কঠিন পড়াশোনা বা লেখার সময়: প্রথমে নীরব পরিবেশে কাজ করে দেখুন।

গান শুনতেই হলে: গানের কথা নেই এমন যন্ত্রসংগীত বেছে নিতে পারেন।

সহজ বা পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের সময়: পছন্দের গান মন ভালো রাখতে ও একঘেয়েমি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

গান শুনে পড়ার সময়: বারবার গানের দিকে মন চলে যাচ্ছে কি না খেয়াল করুন।

একই কাজের ক্ষেত্রে পরীক্ষা করুন: একদিন গান দিয়ে এবং আরেকদিন নীরবে কাজ করে দেখুন। কোন পরিবেশে আপনি দ্রুত ও নির্ভুলভাবে কাজ করতে পারছেন, সেটি বোঝা সহজ হবে।

তাহলে গান শুনে পড়বেন, নাকি নীরবে?

এর উত্তর ব্যক্তিভেদে এবং কাজভেদে আলাদা। গান শুনলে যদি আপনার মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয় এবং কাজের মান কমে না যায়, তাহলে পটভূমির সংগীত ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে কঠিন পড়াশোনা, লেখা বা এমন কাজ যেখানে ভাষা ও স্মৃতির ওপর বেশি চাপ পড়ে, সেখানে গানের কথা আছে এমন গান এড়িয়ে চলা ভালো হতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, গান শুনে কাজ করতে আপনার ভালো লাগছে কি না, শুধু সেটি নয়। কাজটি আপনি কতটা ভালোভাবে করতে পারছেন, কতটা মনে রাখতে পারছেন এবং কতবার মনোযোগ হারাচ্ছেন, সেটিও খেয়াল করতে হবে।

কাজ বা পড়ার সময় গান শোনা সবার মনোযোগ বাড়ায়, এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। আবার গান শুনলেই মনোযোগ নষ্ট হয়, এমন কথাও ঠিক নয়। গবেষণায় বরং দেখা যাচ্ছে, গানের ধরন, গানের কথা আছে কি না, কাজের জটিলতা এবং ব্যক্তির অভ্যাসের ওপর ফলাফল বদলে যায়।

তাই কঠিন পড়াশোনা বা মনোযোগনির্ভর কাজের সময় নীরবতা দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। আর সহজ বা একঘেয়ে কাজের ক্ষেত্রে পছন্দের পটভূমির সংগীত কাজে আগ্রহ ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে।

সূত্র: টিভি ৯