বাড়ির বিদ্যুৎ বিলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জমা হয় ফ্রিজের পেছনে। যেহেতু এই যন্ত্রটি বছরের পর বছর প্রায় অবিরাম চালু থাকে, তাই এর বিদ্যুৎ খরচ নিয়ন্ত্রণ করা গৃহস্থালির জন্য জরুরি। বিশেষ করে পুরোনো বা যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণহীন ফ্রিজগুলো তুলনামূলক বেশি শক্তি ব্যবহার করে। তবে নতুন যন্ত্র কেনার আগেই কিছু সহজ অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে ফ্রিজের দক্ষতা বাড়ানো এবং বিদ্যুৎ খরচ কমানো সম্ভব। এর মধ্যে অন্যতম কার্যকরী ও সহজ কৌশল হলো—ফ্রিজের খালি জায়গায় পানিভর্তি বোতল রাখা।
ফ্রিজের ভেতরে যদি খালি জায়গা বেশি থাকে, তবে দরজা খোলার সময় বাইরের উষ্ণ বাতাস সহজেই ভেতরে ঢুকে পড়ে। সেই বাতাস ঠান্ডা করতে কম্প্রেসরকে আবার কাজ করতে হয়, যা বিদ্যুৎ খরচ বাড়ায়। অন্যদিকে, ফ্রিজের ভেতরে পানিভর্তি বোতল থাকলে ঠান্ডা পানির ভর তাপমাত্রা স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। একটি সরকারি এনার্জি গাইডেও খালি ফ্রিজের জায়গা পূরণের জন্য পানির বোতল ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, কয়েকটি বোতল রাখলেই বিদ্যুৎ বিল নাটকীয়ভাবে কমবে না; এটি কেবল একটি সহায়ক পদক্ষেপ।
ফ্রিজে পানির বোতল রাখার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। পরিষ্কার ও ভালোভাবে বন্ধ করা যায় এমন বোতলে পানি ভরে সেগুলো এমন জায়গায় রাখতে হবে যাতে ঠান্ডা বাতাস চলাচলে কোনো বাধা না পায়। একসাথে অতিরিক্ত বোতল ঢুকিয়ে ফ্রিজ ঠাসা করে ফেলবেন না, কারণ ঠান্ডা বাতাসের প্রবাহের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা থাকা প্রয়োজন। এছাড়াও, পানির বোতল একেবারে কানায় কানায় পূর্ণ করে রাখবেন না, কারণ পানি বরফ হলে আয়তন বাড়ে এবং বোতল ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
শুধুমাত্র পানির বোতল রাখার ওপর নির্ভর না করে আরও কিছু অভ্যাস মেনে চললে ফ্রিজের বিদ্যুৎ খরচ আরও কমানো সম্ভব। প্রথমত, অযথা ফ্রিজের দরজা খুলবেন না। বারবার দরজা খুললে উষ্ণ বাতাস ভেতরে ঢোকে, ফলে নির্ধারিত তাপমাত্রা ধরে রাখতে ফ্রিজকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। তাই কী নিতে হবে তা আগে ঠিক করে দরজা খোলা এবং দরজা যত কম সম্ভব খোলা রাখা উচিত।
দ্বিতীয়ত, ফ্রিজের চারপাশে পর্যাপ্ত জায়গা রাখুন। ফ্রিজকে দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে রাখবেন না; পেছনে ও পাশে বাতাস চলাচলের সুযোগ থাকলে তাপ বের হতে সুবিধা হয়। প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী দেয়াল থেকে প্রয়োজনীয় দূরত্ব বজায় রাখলে ফ্রিজের দক্ষতা বাড়ে। তৃতীয়ত, অতিরিক্ত গরম খাবার সরাসরি ফ্রিজে রাখবেন না। চুলা থেকে নামানো খাবার কিছুটা ঠান্ডা হওয়ার পর সংরক্ষণ করুন, তবে নিরাপত্তার জন্য রান্না করা খাবার দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় রেখে দেওয়া উচিত নয়।
চতুর্থত, দরজার রাবার সিল নিয়মিত পরীক্ষা করুন। সিল ঢিলা বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে যায়, ফলে কাঙ্ক্ষিত তাপমাত্রা ধরে রাখতে ফ্রিজকে বেশি সময় কাজ করতে হয়। পঞ্চমত, তাপমাত্রা অপ্রয়োজনে খুব কম রাখবেন না। মার্কিন জ্বালানি বিভাগের নির্দেশনায় সাধারণ রেফ্রিজারেটরের জন্য প্রায় ৩৬ থেকে ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট, অর্থাৎ প্রায় ২ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে আপনার ফ্রিজের প্রস্তুতকারকের নির্দেশনাই অনুসরণ করা উচিত।
ষষ্ঠতত, পুরোনো ফ্রিজের কনডেনসার পরিষ্কার রাখুন। পুরোনো মডেলের কিছু ফ্রিজে পেছনে বা নিচে কনডেনসার কয়েল থাকে, যেখানে ধুলো জমলে তাপ বের হওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। পরিষ্কার করার আগে প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা দেখুন এবং প্রয়োজন হলে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করুন।
সপ্তমত, ফ্রিজের অবস্থানও বিদ্যুৎ খরচে প্রভাব ফেলে। চুলা, ওভেন বা সরাসরি রোদ পড়ে এমন জায়গার পাশে ফ্রিজ রাখলে বাইরের তাপের কারণে যন্ত্রটিকে বেশি কাজ করতে হয়। তাই তুলনামূলক ঠান্ডা ও বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় ফ্রিজ রাখা ভালো।
পানিভর্তি বোতল ফ্রিজের খালি জায়গা পূরণ করে ঠান্ডা ধরে রাখতে কিছুটা সাহায্য করলেও, এটিকে বিদ্যুৎ বিল কমানোর কোনো নিশ্চিত বা বড় ধরনের উপায় হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ফ্রিজের মোট বিদ্যুৎ খরচে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলতে পারে যন্ত্রের দক্ষতা, বয়স, আকার, দরজার সিল, তাপমাত্রা সেটিং এবং ব্যবহারের ধরন। তাই খালি ফ্রিজে পানির বোতল রাখা যেতে পারে একটি সহজ অভ্যাস হিসেবে, কিন্তু বিদ্যুৎ বিল কমানোর জন্য এর পাশাপাশি দরজা কম খোলা, সঠিক তাপমাত্রা রাখা, দরজার সিল ঠিক রাখা এবং ফ্রিজের চারপাশে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করাও জরুরি।
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস