বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকার ছেলে অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, শিশুদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই দায়িত্বে থাকার কোনো অধিকার নেই।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রংপুর জিলা স্কুল মাঠে ঢাকা-রংপুর লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বিএনপি ও তার চেয়ারম্যান শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ইতিহাসের তুলনা করে বলেন, "বিএনপিকে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভূতে’ চেপে ধরেছে। এই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভূত শেখ হাসিনাকেও চেপে ধরেছিল। সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার অহংকার ও দাম্ভিকতায় তিনি কর্তৃত্ববাদী ফ্যাসিবাদে পরিণত হয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত পালিয়ে দিল্লিতে আশ্রয় নিতে হয়েছে। আপনারা এই অহংকার ও দাম্ভিকতা পরিহার করুন।"
উত্তরবঙ্গের মানুষের দাবি এবং সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, "উত্তরবঙ্গের মানুষের বাঁচা-মরার দাবি তিস্তা ব্যারাজ। আপনি তিস্তা দিতে পারেন না। দিল্লির ভয়ে সেখান থেকে ফিরে এসেছেন। বাজার কমিটি, হাট কমিটিসহ বিরোধীদের আসনগুলোতে মহিলা এমপিদের নিয়োগ দিয়ে আপনি স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছেন। সময় থাকতে তওবা করে ভুল স্বীকার করুন। দাবি না মানলে এই আট দফা এক দফায় রূপান্তরিত হতে পারে।"
লংমার্চের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে জামায়াতের এই নেতা জানান, রাজধানী থেকে রংপুরের পথে হাজারো মানুষের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল তারা কেমন আছেন। মানুষের উত্তর ছিল, তারা ভালো নেই। তিনি বলেন, "রংপুরবাসী, আপনারা ভালো নেই বলেই এই লংমার্চের আয়োজন করা হয়েছে।"
নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে বিএনপির ওপরও ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, নির্বাচনের ছয়-সাত মাসের মধ্যেই জাতির সঙ্গে করা সবচেয়ে বড় ওয়াদা ভঙ্গ করেছে বিএনপি সরকার—এমন অভিযোগ মানুষের। উত্তরবঙ্গে এসে তারেক রহমান বলেছিলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিন। ১২ ফেব্রুয়ারিও তিনি ভোট দিয়েছিলেন, আমরা টেলিভিশনে দেখেছি। আমরা বিশ্বাস করেছিলাম, তিনিও ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন। কিন্তু সেই ভোটের পর যে সংসদ গঠন হলো, সেই সংসদে ক্ষমতাসীন দল গণভোটে ৭০ শতাংশ ভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হওয়ার পরও সেই গণভোটের রায় বাতিলের জন্য বিল উত্থাপন করে গণরায় বাতিলের চক্রান্ত করেছে।
বিরোধী দলের সমালোচনার জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, তারা বলেন, বিরোধী দল মুনাফেকি করে। বিরোধী দলের ওপর ভূত চেপে বসেছে। বিরোধী দল দেশকে অস্থিতিশীল করছে। আমরা বলতে চাই, ভূত বিরোধী দলের ওপর চাপেনি; ভূত চেপেছে বিএনপির ওপর। সেই ভূত হলো সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভূত, মেজরিটির ভূত।
তিনি আরও বলেন, সেই মেজরিটির ভূতে কোরআন-সুন্নাহর হেবা আইন বাতিল করে কোরআন-সুন্নাহর বিপক্ষে তারা অবস্থান নিয়েছে। মেজরিটির জোরে ৭০ শতাংশ জনগণের রায় বাতিল করে গণভোটের বিপক্ষে তারা অবস্থান নিয়েছে।
জুলাইয়ের আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, জুলাইয়ের রক্তাক্ত আন্দোলনের ১ হাজার ৪০০ শহীদ ও ৪০ হাজার আহতের এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য রাষ্ট্র সংস্কারের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অসীম ক্ষমতার লাগাম টেনে সব সাংবিধানিক পদে নিরপেক্ষ থেকে একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেশের মানুষ দেখেছিল, আবু সাঈদ-মুগ্ধরা দেখেছিল। মেজরিটির জোরে বিএনপি সেই স্বপ্ন ধূলিসাৎ করেছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘তারা সংসদে বিশেষ কমিটি করে সংবিধান সংশোধনের নামে জুলাই সনদের মৌলিক কাঠামো বাতিল করতে চায়। তার বিরুদ্ধে ১১ দলের এই আন্দোলনে আপনারা কি পাশে আছেন? গণভোটের রায় বাস্তবায়নের প্রশ্নে আমরা কোনো হুমকি-ধমকি বা চক্রান্তকে ভয় করব না। আমরা এক চুল পরিমাণ ছাড় দেব না। এই দাবি পূরণ করেই আমরা ঘরে ফিরব।'
সরকারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, তারা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তারা খুন, গুম ও রাহাজানি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আজকে খবর পেলাম, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সহকারী প্রক্টরের শিশুকে অপহরণের তিন দিন পরও উদ্ধার করা হয়নি। আজকে তার লাশ পাওয়া গেল। শিশুরা ধর্ষিত হবে, খণ্ডিত লাশ পাওয়া যাবে; আর আপনি সংসদে বসে সংবিধানের ব্যাখ্যা দেবেন।