ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনকে ১৯৯৪ সালের মাগুরার উপনির্বাচনের মতো পরিস্থিতি হতে না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রতি এই অনুরোধ জানান তিনি।
গতকাল রোববার বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “নির্বাচন নিরপেক্ষ হলে আমরা নির্বাচনে অংশ নেব। আমরা এখনো নির্বাচন থেকে উঠে যাইনি। আমরা নির্বাচন করার জন্যই এখানে এসেছি। আমাদের প্রার্থী মাঠে আছে।…সরকারকে, ইলেকশন কমিশনকে বলব, এই নির্বাচনটাকে মাগুরার নির্বাচনে রূপান্তরিত করবেন না।”
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ১৯৯৪ সালের মাগুরার উপনির্বাচনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, সে সময় বিএনপি সবকিছু নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছিল। তবে সেই নির্বাচনই শেষ পর্যন্ত তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপির পতনের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সব রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি জোরালো হয়। শেষ পর্যন্ত সেই গণআন্দোলন সামাল দিতে না পেরে সংসদ ভেঙে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানতে তারা বাধ্য হয়েছিল।
গোলাম পরওয়ার জানান, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় একটি প্রতিনিধিদল সেখানে গিয়েছিল। সরেজমিনে পরিদর্শন করে তারা সুনির্দিষ্ট ৯টি অভিযোগ পেয়েছে। এই অভিযোগগুলো লিখিতভাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে জানানো হয়েছে এবং প্রমাণের স্বপক্ষে প্রয়োজনীয় নথিপত্রও দেওয়া হয়েছে।
ইউএনওর বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ
ঠাকুরগাঁও সদর থানার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাইরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সরাসরি নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছেন জামায়াত নেতারা এবং তাঁর অপসারণ দাবি করেছেন। এ প্রসঙ্গে গোলাম পরওয়ার বলেন, খাইরুল ইসলাম বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। অভিযোগ পাওয়া গেছে যে, প্রার্থী রাতে তাঁর বাড়িতে যাচ্ছেন এবং টাকার বিনিময়ে তিনি প্রার্থীর হয়ে কাজ করছেন।
সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি
নির্বাচন স্বচ্ছ করতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে (সিইসি) সেনাবাহিনী মোতায়েনের অনুরোধ জানিয়েছেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের চাপ উপেক্ষা করে পুলিশ একা এই নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে পারবে না। এছাড়া প্রশাসনিক কর্মকর্তা, নির্বাচন পরিচালনায় নিয়োজিত জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এবং সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণ নিরপেক্ষ নয়। এই মানসিকতা পরিবর্তন না হলে নির্বাচন নিরপেক্ষ হওয়া সম্ভব নয়।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আরও অভিযোগ করেন যে, একদিকে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করা হচ্ছে, অন্যদিকে জামায়াতের নারী ও পুরুষ নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালিয়ে আহত করা হচ্ছে। হামলাকারীদের ছবি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে দেওয়া হয়েছে এবং তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ঠাকুরগাঁওয়ে একটি মসজিদে সোফা বসিয়ে ধানের শীষের প্রার্থী নির্বাচনী সভা করেছেন। এছাড়া আচরণবিধি লঙ্ঘন করে ধানের শীষের রঙিন প্রতীক ব্যবহার করা হচ্ছে এবং দুপুর দুইটার আগেই মাইক ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি ইউনিয়নে ইউনিয়নে মেডিকেল ক্যাম্প বসিয়ে সরকারি চিকিৎসকদের মাধ্যমে প্রার্থীর পক্ষে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী নিজেকে রাষ্ট্রপতির ভাই হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। এই আসনে প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার হিন্দু ভোটার রয়েছেন, যাদের অনেকেই সরকারি চাকরিজীবী বা শিক্ষক। জামায়াতের দাবি, বিএনপির প্রার্থী ও নেতা-কর্মীরা তাঁদের হুমকি দিচ্ছেন যে, দাঁড়িপাল্লার পক্ষে কাজ করলে তাঁদের চাকরি থাকবে কি না। এই পরিস্থিতির কারণে হিন্দু ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার সাহস পাবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে গোলাম পরওয়ার বলেন, “এ নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক চাপের কাছে অসহায়। তার সাংবিধানিক যে ক্ষমতা আছে, কমিশন সে ক্ষমতা প্রয়োগ করছে না।”
সাক্ষাৎকার ও সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সাথে আরও উপস্থিত ছিলেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, অবসরপ্রাপ্ত সচিব শরীফ আল জিন্নাহ, সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব খ ম কবিরুল ইসলাম এবং জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি ইয়াসিন আরাফাত প্রমুখ।