স্থানীয় সরকার ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে আয়োজিত গুরুত্বপূর্ণ সভায় অনেক জেলা ও উপজেলা প্রকৌশলীর অনুপস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, মন্ত্রী বড় নাকি স্থানীয় সংসদ সদস্য—কর্মকর্তারা বিষয়টি স্পষ্ট করতে পারছেন না কিনা।
আজ শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এলজিইডি ভবনে অনুষ্ঠিত এই সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী কর্মকর্তাদের দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি জানান, আমন্ত্রণ সত্ত্বেও অনেকেই সভায় যোগ দেননি।
সভায় উপস্থিত কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, "মন্ত্রী বড়, না স্থানীয় সংসদ সদস্য বড়—এটা তিনি বুঝতে পারছেন না। কর্মকর্তাদের নিয়ে কী সভা করবেন, সেটিও বুঝতে পারছেন না।" তিনি বিষয়টি নোট করে রাখার নির্দেশ দিয়ে বলেন, "কর্মকর্তাদের এখানে ফাজলামি বা পিকনিক করতে আসার সুযোগ নেই; একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তাঁদের ডাকা হয়েছে।"
সভার একপর্যায়ে রাঙামাটি জেলার কর্মকর্তাদের দাঁড়াতে বলে প্রতিমন্ত্রী জানতে চান, ওই জেলায় কতটি উপজেলা রয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, সেখানে ১০টি উপজেলা। এরপর উপস্থিত কর্মকর্তাদের গুনে তিনি বলেন, "তাঁরা ছয়জন দাঁড়িয়েছেন; বাকি চারজন কোথায়?" একজন কর্মকর্তা জানান, অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তা অনুপস্থিত। প্রতিমন্ত্রী জানতে চান, তিনি কোথায় আছেন এবং তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী কি না। এরপর তিনি বাকি উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতির কারণ জানতে চান। তখন মঞ্চের সামনে থেকে একজনকে বলতে শোনা যায়, ওই নির্বাহী প্রকৌশলী এলাকায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে একটি সভায় আছেন।
এতে প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোনো উপজেলা বা এলাকার উদ্বোধন নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য কিছু বললে কর্মকর্তাদের বিষয়টি সমন্বয় করতে হবে। সংসদ সদস্যকে বলতে হবে, মন্ত্রী, সচিব ও প্রতিমন্ত্রী তাঁদের সভায় ডেকেছেন। প্রয়োজন হলে সংসদ সদস্যকে জানিয়ে দিতে হবে যে তাঁর সঙ্গে পরদিন বা পরশু বসবেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্যকে মন্ত্রী, সচিব ও প্রতিমন্ত্রীর চেয়ে বড় মনে করে অনুপস্থিত থাকা যাবে না।
এরপর বান্দরবান জেলার কর্মকর্তাদের দাঁড়াতে বলেন প্রতিমন্ত্রী। বান্দরবানে কতটি উপজেলা, তা জানতে চান। কর্মকর্তারা জানান, সাতটি উপজেলা। এরপর উপস্থিত কর্মকর্তাদের দাঁড় করিয়ে তিনি বলেন, সাতটি উপজেলার মধ্যে মাত্র একজন দাঁড়িয়েছেন। বাকি কর্মকর্তারা কোথায়, তা জানতে চান। প্রতিমন্ত্রী অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিষয়েও জানতে চান। তিনি বলেন, সব জেলার কর্মকর্তাদের একসঙ্গে দাঁড় করালে উপস্থিতির অবস্থা আরও ভয়াবহ মনে হতে পারে। তিনি জানতে চান, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোথায়। তিনি এ সময় উপস্থিত কর্মকর্তাদের দিয়ে অনুপস্থিতদের খোঁজ নেওয়ার কথাও বলেন। তিনি জানতে চান, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দ্বিতীয় ব্যক্তি বা বিকল্প দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউও কেন উপস্থিত নেই।
প্রতিমন্ত্রী এরপর প্রশ্ন করেন, অনুপস্থিত কর্মকর্তাদের ডাকা হয়নি কেন। কর্মকর্তারা কেন আসেননি, তা তিনি বুঝতে পারছেন না বলেও জানান। একজন উপজেলা প্রকৌশলী সভায় উপস্থিত না থাকায় তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার নির্দেশ দেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বিষয়টি নোট করে রাখতে বলেন। ওই কর্মকর্তা সন্তোষজনক জবাব না দিলে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, কর্মকর্তাদের নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে সভা করা হচ্ছে। অথচ একজন উপজেলা প্রকৌশলীও উপস্থিত নেই। এভাবে সভায় অনুপস্থিত থেকে ফাজলামি করার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, কর্মকর্তারা এখানে পিকনিক করতে আসেননি।
এরপর খাগড়াছড়ি জেলার কর্মকর্তাদের দাঁড়াতে বলেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি উপস্থিত কর্মকর্তাদের দেখিয়ে জানতে চান, বাকিরা কোথায়। একইভাবে জেলার সব কর্মকর্তার উপস্থিতি যাচাই করেন তিনি। এই জেলা থেকে তিনজন দাঁড়ান। বাকিরা কোথায় জানতে চান।
পরে ভোলা জেলার মনপুরা উপজেলার নির্বাহী প্রকৌশলী সভায় আছেন কি না, জানতে চান প্রতিমন্ত্রী। তাঁকে জানানো হয়, তিনি উপস্থিত আছেন। এরপর তিনি নেত্রকোনা জেলার কর্মকর্তাদের দাঁড়াতে বলেন। নেত্রকোনা জেলায় কতটি উপজেলা, তা জানতে চান। উপস্থিত কর্মকর্তাদের দেখে তিনি আবারও জানতে চান, বাকি কর্মকর্তারা কোথায়।
প্রতিমন্ত্রী জানতে চান, ওই জেলার কতজন কর্মকর্তা উপস্থিত আছেন। তিনি বলেন, তাঁর মনে হচ্ছে প্রায় প্রতিটি জেলাতেই দু-তিনজন করে কর্মকর্তা সভায় আসেননি। এরপর কর্মকর্তাদের হাজিরার অবস্থা জানতে চান প্রতিমন্ত্রী। তাঁকে জানানো হয়, ৫০৩ জনের মধ্যে ৪৪০ জন উপস্থিত রয়েছেন। অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার সংখ্যা কত, তা-ও জানতে চান তিনি। সবশেষে তিনি নির্বাহী প্রকৌশলীদের উপস্থিতির বিষয়ে জানতে চান। নির্বাহী প্রকৌশলীরা সবাই সভায় এসেছেন কি না, তা নিশ্চিত হতে চান। কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে তাঁকে জানানো হয়, নির্বাহী প্রকৌশলীদের সবাই উপস্থিত আছেন।
মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সভায় প্রতিমন্ত্রী বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, হাটবাজারসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে সৌর প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হবে। উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর পাশাপাশি স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় বাড়ানো সম্ভব। তিনি কর্মকর্তাদের নিজ নিজ দপ্তরে সোলার প্যানেল স্থাপনে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা দেন।
সভায় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আবদুল মঈন খান, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব শহীদুল হাসান, এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেনসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী, এলজিইডির চলমান প্রকল্পগুলোর প্রকল্প পরিচালক এবং উপজেলা প্রকৌশলীরা উপস্থিত ছিলেন।