পটুয়াখালীর এক হোটেল মালিক দেনা পরিশোধের চাপ এড়াতে নিজের অপহরণের নাটক সাজিয়ে দীর্ঘ সাড়ে চার বছর আত্মগোপনে ছিলেন। অবশেষে মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার একটি বেদেপল্লি থেকে তাকে উদ্ধার করেছে পটুয়াখালী জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

ওই হোটেল মালিকের নাম আব্দুল মান্নান প্যাদা (৭০)। তিনি পটুয়াখালী সদর উপজেলার ইটবাড়িয়া ইউনিয়নের বল্লভ গ্রামের জয়নাল আবেদীন প্যাদার ছেলে।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) রাতে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করে পটুয়াখালী জেলা পুলিশ। এর আগে বুধবার রাত ১টার দিকে কালকিনি উপজেলার ওই বেদেপল্লিতে অভিযান চালিয়ে তাকে উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ জানায়, হোটেল পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল স্থানীয় একটি মুদি দোকানসহ বিভিন্ন স্থান থেকে বাকিতে সংগ্রহ করতেন মান্নান। তবে পাওনাদারদের কাছ থেকে নিজস্ব বকেয়া টাকা উদ্ধার করতে না পারায় নিজের দেনাও পরিশোধ করতে পারছিলেন না তিনি। এতে পাওনাদারদের চাপ ক্রমেই বাড়তে থাকে।

ডিবি পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে হোটেলের ম্যানেজার মো. নুর আলম সিকদারের পরামর্শে আত্মগোপনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মান্নান। পরিকল্পনা অনুযায়ী তাকে অপহরণ করা হয়েছে বলে একটি নাটক সাজানো হয়।

ঘটনার পর মান্নানের ছেলে মো. জসিম প্যাদা পটুয়াখালী সদর থানায় নিখোঁজের বিষয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ১৪ আগস্ট পাওনাদারদের বিরুদ্ধে অপহরণের অভিযোগ এনে দণ্ডবিধির ৩৬৪, ৩৬৫ ও ১০৯ ধারায় আদালতে একটি মামলা করা হয়।

তদন্তে উঠে আসে, নিখোঁজের পর দীর্ঘ সাড়ে চার বছর পটুয়াখালী, ঢাকা, আখাউড়া, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও যশোরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ে অবস্থান করেন মান্নান।

পুলিশ জানায়, আত্মগোপনে থাকাকালে কখনো মাজারে অবস্থান করেছেন, কখনো দারোয়ানের চাকরি করেছেন, আবার কখনো বেদেপল্লিতে ছদ্মবেশে দিন কাটিয়েছেন তিনি। একপর্যায়ে বাগেরহাটের একটি মাজারে কাজল নামের এক নারীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরবর্তীতে ওই নারীর বরিশালের বাসায় এবং সেখান থেকে তার ভগ্নিপতির মাদারীপুরের বাড়িতে আশ্রয় নেন মান্নান।

তদন্তকারীদের ভাষ্য, আত্মগোপনে থেকেও ছেলের মাধ্যমে পাওনাদারদের বিরুদ্ধে করা অপহরণ মামলাটি সচল রাখেন তিনি। মিথ্যা এ মামলায় আসামিরা কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন কি না, সেটিও পুলিশের তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।

অবশেষে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মান্নানের অবস্থান শনাক্ত করে পটুয়াখালী ডিবি। এরপর বুধবার গভীর রাতে কালকিনির বেদেপল্লি থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়।

পটুয়াখালী জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম সজল বলেন, "প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মান্নান স্বীকার করেছেন, দেনা পরিশোধ করতে না পেরে পাওনাদারদের ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে নিজের অপহরণের নাটক সাজিয়ে আত্মগোপনে যান। দীর্ঘ সময় বিভিন্ন ছদ্মবেশে থাকায় তার অবস্থান শনাক্ত করতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে।"

তিনি আরও জানান, "উদ্ধারের পর মান্নানকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। মামলাটির তদন্ত বর্তমানে চলমান।"

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, "অপহরণ মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। একইসঙ্গে হোটেলের ম্যানেজার নুর আলম সিকদারসহ অন্য কেউ এ ঘটনায় জড়িত কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"