সিলেট মহানগর বিএনপির উপদেষ্টা পরিষদে তিনজন ‘অচেনা’ প্রবাসীকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয়েছে। আপত্তি, সমালোচনা এবং গঠনতন্ত্র না মানা—মূলত এই তিন কারণে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চার দিনের মাথায় বিষয়টি নিয়ে পিছু হটেছেন সিলেট মহানগর নেতৃত্ব।
উপদেষ্টা পরিষদে অন্তর্ভুক্ত করা তিনজন হলেন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী ফয়ছল আহমদ ও মোহাম্মদ হুমায়ুন মিলাদ এবং যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সাইফুর হারুন। তাঁদের উপদেষ্টা পরিষদে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি ১৩ সেপ্টেম্বর এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছিলেন সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসেইন ও সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী। এর পর থেকে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় বিএনপিতে ব্যাপক আলোচনা–সমালোচনা শুরু হয়।
কমিটি সিলেট মহানগরের। আর উপদেষ্টা করা হচ্ছে প্রবাসীদের। প্রবাসে থেকে তাঁরা কীভাবে দেশে থাকা নেতা-কর্মীদের উপদেশ দেবেন? এটি উল্লেখ করেই সাংগঠনিক সভায় আমি প্রতিবাদ জানিয়েছি।
সিলেট মহানগর বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছিল, যাঁদের উপদেষ্টা করা হয়েছে, তাঁরা দলীয় রাজনীতিতে ‘অচেনা’। কেন্দ্রের অনুমতি ছাড়াই তাঁদের অগঠনতান্ত্রিকভাবে উপদেষ্টা পরিষদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করলে সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসেইন আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘বিষয়টি (উপদেষ্টা পরিষদের তিনজন সংযোজনের বিজ্ঞপ্তি) আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। এর গঠনপ্রক্রিয়া যথাযথ ছিল না।’
তিনজন প্রবাসীকে উপদেষ্টার পদ দেওয়া নিয়ে যুক্তরাজ্যে থাকা বিএনপির দুজন নেতা, যুক্তরাষ্ট্রে থাকা একজন এবং সিলেট মহানগরের চারজন নেতার সঙ্গে কথা বলেছে মুক্তকণ্ঠ। তাঁরা বলেছেন, উপদেষ্টা পরিষদে পদ পাওয়া তিনজনের কেউই রাজনৈতিকভাবে পরিচিত নন। তাঁরা সেভাবে দলীয় কর্মকাণ্ডে (যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে) কখনো অংশ নেননি।
ফয়সল আহমদ জাসাসের একটি পদে ছিলেন, তবে তিনি যুক্তরাজ্য বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় নন। অন্যদিকে মোহাম্মদ হুমায়ুন দলীয় রাজনীতিতে তেমন পরিচিত নন। আমরা বিএনপির নেতা-কর্মীরা উনাকে চিনি না। মহানগর বিএনপির উপদেষ্টা পরিষদে তাঁরা ঠাঁই পাওয়ায় যুক্তরাজ্য বিএনপিতেও সমালোচনা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্য বিএনপির দুইবারের সাবেক জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য শহীদুল ইসলামের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলেছে মুক্তকণ্ঠ। তিনি বলেন, ‘ফয়সল আহমদ জাসাসের একটি পদে ছিলেন, তবে তিনি যুক্তরাজ্য বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় নন। অন্যদিকে মোহাম্মদ হুমায়ুন দলীয় রাজনীতিতে তেমন পরিচিত নন। আমরা বিএনপির নেতা-কর্মীরা উনাকে চিনি না। মহানগর বিএনপির উপদেষ্টা পরিষদে তাঁরা ঠাঁই পাওয়ায় যুক্তরাজ্য বিএনপিতেও সমালোচনা হচ্ছে।’
যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সাইফুর হারুনের বিষয়ে সেখানে থাকা বিএনপির একজন নেতার সঙ্গে কথা বলেছে মুক্তকণ্ঠ। একই বিষয়ে মুক্তকণ্ঠ কথা বলেছে সিলেট মহানগর বিএনপির চারজন নেতার সঙ্গে। কেউই তাঁর বিষয়ে তথ্য দিতে পারেননি।
তিন প্রবাসীকে উপদেষ্টা করার সিদ্ধান্তের বিষয়ে সিলেট মহানগর বিএনপির একজন দায়িত্বশীল নেতা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি, একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর ভাইয়ের সুপারিশের ভিত্তিতে ওই তিন প্রবাসীকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। অথচ দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এ ধরনের পদে কোনোভাবেই মহানগর বিএনপির সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদকের অনুমোদন দেওয়ার সুযোগ নেই।’
বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, চেয়ারম্যানের পরামর্শক্রমে দলের মহাসচিব মহানগর নির্বাহী কমিটির অনুমোদন দেবেন। স্থানীয়ভাবে সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদকের এ ধরনের অনুমোদন দেওয়ার সুযোগ নেই।
সিলেট মহানগর বিএনপির কমিটি গঠিত হয় ২০২৩ সালের ১০ মার্চ সম্মেলনে, ভোটের মাধ্যমে। এতে সভাপতি পদে নাসিম হোসাইন, সাধারণ সম্পাদক পদে ইমদাদ হোসেন চৌধুরী ও সাংগঠনিক সম্পাদক পদে সৈয়দ সাফেক মাহবুব দায়িত্ব পান। তবে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য ২০২৪ সালের ১ আগস্ট সভাপতির পদ থেকে নাসিম হোসাইনকে সরিয়ে কেন্দ্রীয় বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ্ সিদ্দিকীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এরপর ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর সিলেট মহানগর বিএনপির ১৭০ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটির অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় কমিটি। ঘোষিত পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক প্যানেল মেয়র রেজাউল হাসান কয়েস লোদীকে। পরে চলতি বছরের ৬ আগস্ট আবার নাসিম হোসাইনকে স্বপদে বহাল করে কেন্দ্রীয় কমিটি।
রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও ইমদাদ হোসেন চৌধুরী দায়িত্ব পালনকালে প্রথমবারের মতো বর্তমান মহানগর কমিটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়। গত জুন মাসে ৫৭ জন নেতাকে ওই উপদেষ্টা পরিষদে রাখা হয়।
জুনে উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের বিষয়ে রেজাউল হাসান কয়েস লোদী বলেন, ‘প্রথমে মৌখিকভাবে, পরে লিখিতভাবে কেন্দ্রীয় কমিটির সংশ্লিষ্টদের অবহিত করেই আমরা উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেছিলাম।’
সর্বশেষ ১৩ সেপ্টেম্বর নতুন করে আরও তিনজনকে উপদেষ্টা পরিষদে নেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে গতকাল বুধবার রাতে অনুষ্ঠিত মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সভায় আলোচনা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক জি কে গউছ।
মহানগর বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, কেন্দ্রকে অবহিত না করে উপদেষ্টা পরিষদে তিনজন প্রবাসীকে পদ দেওয়ার বিষয়ে ওই সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন জি কে গউছ। এ ছাড়া আরও দু–তিনজন নেতা বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এই সভার বিষয়ে ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ও মহানগর বিএনপির সহসভাপতি সাদিকুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘কমিটি সিলেট মহানগরের। আর উপদেষ্টা করা হচ্ছে প্রবাসীদের। প্রবাসে থেকে তাঁরা কীভাবে দেশে থাকা নেতা-কর্মীদের উপদেশ দেবেন? এটি উল্লেখ করেই সাংগঠনিক সভায় আমি প্রতিবাদ জানিয়েছি।’