সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে রাষ্ট্রপতিকে দেওয়া নাগরিক সংবর্ধনা কার্যত ‘বর্জন’ করে মহানগর বিএনপি।
সিলেট নগরকেন্দ্রিক বিএনপির রাজনীতিতে দ্বন্দ্ব-বিভেদ আগেও ছিল। তবে এখন তা অনেকটাই প্রকাশ্য হয়ে পড়েছে। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে এড়িয়ে চলা, অন্য পক্ষের অনুষ্ঠানে না যাওয়ার মতো ঘটনা বেড়েছে। এতে কর্মী-সমর্থকেরাও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছেন।
সর্বশেষ গত মঙ্গলবার সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দেওয়া নাগরিক সংবর্ধনাকে কেন্দ্র করে বিভেদের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সিটি প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীর বিরুদ্ধে ‘স্বেচ্ছাচারিতার’ অভিযোগ এনে মহানগর বিএনপি ওই অনুষ্ঠান কার্যত ‘বর্জন’ করেছে।
দীর্ঘদিন ধরেই সিলেটের রাজনীতিতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির এবং প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর অনুসারীরা বেশ সক্রিয়। সাম্প্রতিক সময়ে আরেকটি পক্ষ সক্রিয় হয়েছে, তারা পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ূন কবীরের অনুসারী।
মহানগর বিএনপির ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন পেতে বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের অন্তত আটজন নেতা তৎপর আছেন। সাম্প্রতিক দ্বন্দ্ব-বিভেদের মূলে সিটি নির্বাচনের বিষয়টি কাজ করছে।
রাষ্ট্রপতির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কয়েকজন নেতার যোগ না দেওয়ার বিষয়ে সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক কলিম উদ্দিন আহমেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আগামী সিটি নির্বাচনের জন্য দলীয় মনোনয়নকে কেন্দ্র করে এমনটা ঘটেছে বলে মনে কি না। সম্ভবত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজনে সম্পৃক্ত করা না–করা নিয়ে এটা হয়েছে। তবে বিষয়টি শুধু শুনেছি, বিস্তারিত জানি না।’
দীর্ঘদিন ধরেই সিলেটের রাজনীতিতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির এবং প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর অনুসারীরা বেশ সক্রিয়। মহানগর বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের ছয়জন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে আরেকটি পক্ষ সক্রিয় হয়েছে, তারা পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ূন কবীরের অনুসারী। সিটি নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে রেষারেষি আরও বেড়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন ওই নেতারা।
সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে কয়েকজন নেতার নাম আলোচনায় আছে। এর মধ্যে রয়েছেন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী; মহানগর বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী; বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেট ওয়াসার চেয়ারম্যান মিফতাহ্ সিদ্দিকী; সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাছিম হোসেইন ও সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী; জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ সিদ্দিকী; মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান।
এর আগে ২০২৫ সালের ২০ মে রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও ইমদাদ হোসেন চৌধুরীর পাল্টাপাল্টি তর্কে জড়ানোর বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
নাম না প্রকাশ করার শর্তে মহানগর বিএনপির দুজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, কাইয়ুম চৌধুরী, কয়েস লোদী, নাছিম হোসেইন, ইমদাদ হোসেন ও দেলোয়ার হোসেন বাণিজ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রীর কাছের মানুষ হিসেবে ইশতিয়াক আহমেদ সিদ্দিকী পরিচিত। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে মিফতাহ্ সিদ্দিকীর সুসম্পর্কের বিষয়টি আলোচনায় আছে। যদিও একটা সময়ে তিনি প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
সিলেট মহানগর বিএনপিতে বিভিন্ন পক্ষ তৈরি হওয়ার বিষয়ে ওয়ার্ড পর্যায়ের চারজন নেতার সঙ্গে কথা বলেছে মুক্তকণ্ঠ। তাঁরা বলেন, সিটি নির্বাচন সামনে রেখে অন্তর্দ্বন্দ্ব বেড়েছে। ১ সেপ্টেম্বর মহানগর বিএনপির অস্থায়ী কার্যালয় উদ্বোধন হয়। সেই অনুষ্ঠানে আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও ইশতিয়াক আহমেদ সিদ্দিকীকে মহানগর বিএনপির পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এর পেছনে সিটি নির্বাচনে প্রার্থিতার বিষয়টি কাজ করেছে।
এর আগে ২০২৫ সালের ২০ মে রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও ইমদাদ হোসেন চৌধুরীর পাল্টাপাল্টি তর্কে জড়ানোর বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। এ নিয়ে তাঁদের কর্মী-সমর্থকেরাও পক্ষে-বিপক্ষে ফেসবুকে সরব ছিলেন।
এ ছাড়া গত বছরের ১ ডিসেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসনের সুস্থতা কামনায় নাছিম হোসেইনের উদ্যোগে এতিম শিশুদের মধ্যে খাবার বিতরণ অনুষ্ঠানে ঝামেলা হয়েছিল। সেদিন রেজাউল হাসান কয়েস লোদীর অনুসারীরা নাছিম হোসেইনকে হেনস্তা করেছিলেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ) আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি মনোনয়ন পাননি। পরে বিএনপি সরকার গঠন করলে তাঁকে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক করা হয়। এর পর থেকেই মেয়র পদে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে তাঁর নাম আলোচনায় আসে।
সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাছিম হোসেইন ও সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছেন, আয়োজকদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে নগরভবনে অনুষ্ঠিত নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেননি মহানগরের অনেক নেতা।
মহানগর বিএনপির তিনজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলের সিলেট জেলা কমিটির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীকে সিটি প্রশাসক করা হবে—এমনটা ভাবেননি মহানগরের রাজনীতি করা বেশির ভাগ নেতা। যে কারণে আগে মহানগরের যেসব নেতা কাইয়ুম চৌধুরীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতেন, তাঁদের অনেকেই এখন তাঁর সঙ্গে দূরত্ব রেখে চলছেন। সর্বশেষ রাষ্ট্রপতির সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বর্জনের ঘটনাটিও সেটির ধারাবাহিকতা।
গত মঙ্গলবার সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাছিম হোসেইন ও সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছেন, আয়োজকদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে নগরভবনে অনুষ্ঠিত নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেননি মহানগরের অনেক নেতা। তবে রাষ্ট্রপতিকে বিমানবন্দরে বরণসহ অন্যান্য আয়োজনে তাঁরা ছিলেন।
রেজাউল হাসান কয়েস লোদীও নাগরিক সংবর্ধনায় অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আন্দোলন-সংগ্রামে যাঁরা নির্যাতিত হয়েছেন, তাঁদের বড় একটি অংশ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পাননি। সে কারণেই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিবেক আমাকে বাধা দিয়েছে।’
নাগরিক সংবর্ধনা দলীয় কোনো বিষয় নয়, এটা সিটি করপোরেশনের নিজস্ব আয়োজন হিসেবে উল্লেখ করেছেন সিলেট সিটির প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বিএনপির মন্ত্রী, সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে নানা পর্যায়ের নেতারা অনুষ্ঠানে এসেছেন।