ঢাকা: ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ৭৬তম জন্মদিন উপলক্ষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৃহস্পতিবার রাতে এক সংক্ষিপ্ত শুভেচ্ছাবার্তা দিয়েছেন। একই রাতে মোদী সেই বার্তার জবাব দিয়ে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। কূটনৈতিক ভাষায় এটি রুটিন শিষ্টাচার। রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি দুই দেশের হিমশীতল সম্পর্কে একটি সস্তা, নিরাপদ এবং হিসাব-নিকাশ করা সংকেত।
তারেক রহমান তাঁর যাচাইকৃত এক্স অ্যাকাউন্ট `@trahmanbnp`-এ লিখেছেন—
"Warmest birthday wishes to Prime Minister @narendramodi. Wishing you many happy returns of the day. May your dedicated service to the people of India always be accompanied by good health and high spirit."
একই পাঠ্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ফেসবুকেও প্রকাশিত হয়, সঙ্গে মোদীর ছবি সম্বলিত একটি শুভেচ্ছা কার্ড। মোদী প্রায় ৩৫ মিনিটের মধ্যে জবাব দেন—
"Thank you, Prime Minister Tarique Rahman, for your warm wishes. I deeply appreciate your kind words."
বার্তা দুটির ভেতরে কোনো দ্বিপক্ষীয় ইস্যু নেই। নেই হাসিনা, নেই তিস্তা, নেই গঙ্গা, নেই সীমান্ত, নেই বাণিজ্য। শুধু পদবী স্বীকার ও শারীরিক কুশলাদি। এই নীরবতাই বার্তা।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক গতি পায়নি। চলতি সেপ্টেম্বরেও সেই ফাইল খোলা।
প্রধান চাপগুলো পরিষ্কার:
- বাংলাদেশ হাসিনা ও অন্য আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রত্যর্পণ চায়। ভারত এখনো সেই অনুরোধের নিষ্পত্তি করেনি।
- সম্প্রতি ভারতীয় মাটিতে হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন ঢাকায় নতুন ক্ষোভ তৈরি করে।
- তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফর এবং বিমসটেক চেয়ার হিসেবে ব্রিকস—দুই আমন্ত্রণই দেওয়া হয়েছিল। তিনি ব্রিকসে যাননি। ঢাকার অবস্থান: সম্পর্ক ‘রিসেট’ হতে হবে দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে, ভারতের আয়োজিত বহুপাক্ষিক মঞ্চে নয়।
- ১৯৯৬ সালের গঙ্গাপানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে। নবায়নের আলোচনা এখনো পুরোদমে শুরু হয়নি। তিস্তা চুক্তিও অস্বাক্ষরিত।
- জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের পর, সম্ভাব্য নভেম্বরকে তারেক রহমানের দিল্লি সফরের জানালা হিসেবে আলোচনা চলছে।
এই পটভূমিতে জন্মদিনের শুভেচ্ছা হলো সবচেয়ে কম খরচের কূটনীতি। কেউ হাঁটু গেড়েনি, কেউ দরজাও বন্ধ করেনি।
এক্স-এর পোস্ট লক্ষ্য দিল্লি, ভারতীয় রাজনৈতিক শ্রেণি ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া। ফেসবুকের পোস্ট লক্ষ্য দেশের ভেতরের পাঠক—যাতে বলা যায়, প্রতিবেশী রাষ্ট্রপ্রধানকে শিষ্টাচার দেখানো রাষ্ট্রীয় রীতি।
মোদীর জবাবও একই কায়দায়: পদবী ব্যবহার, অতিরিক্ত রাজনৈতিক প্রশংসা নেই। দুই পক্ষই ফাইল খোলা রেখেছে, ছাড় দেয়নি।
এক্স-এ তারেক রহমানের পোস্টের নিচে যে প্রতিক্রিয়া উঠেছে, তা মূলত ভারতীয় জাতীয়তাবাদী কোণ থেকে তীব্র।
একজন লিখেছেন, “মোদীজি আরও গুজরাটি ইলিশ পাঠান। সম্ভব হলে ডিজেলও।”
অর্থ: বাংলাদেশকে ভারতনির্ভর ভিক্ষুক হিসেবে দেখানো। ইলিশ বাংলাদেশের মাছ; ‘গুজরাটি ইলিশ’ দিয়ে ঠাট্টা করা হয়েছে বাণিজ্যিক ও জ্বালানি নির্ভরতাকে।
আরেকজন লিখেছেন, ব্রিকস আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়া ঠিক হয়নি, ভারতকে শত্রু ভাবা ঠিক নয়, দেশকে ‘ইস্ট পাকিস্তান’ বানিয়ে ফেললে বন্ধুত্ব থাকবে না।
একই সুতোয় অন্য মন্তব্য: “ট্রেন চলে গেছে”, “হিন্দু হেটার”, “এও বিক্রি হয়ে গেল।”
তারেক রহমানের পোস্টে লাইক ও ভিউ তুলনামূলক কম। মোদীর ধন্যবাদ পোস্টের অংশগ্রহণ বেশি। ভারতীয় ডানপন্থি পাঠকের কাছে শিষ্টাচার এখনো ব্রিকস স্কিপ ও হাসিনা ইস্যুর ক্ষতিপূরণ নয়।
বাংলাদেশের ভেতরে উল্টো চাপও আছে, যদিও সেটি ওই থ্রেডে সমান জোরে দেখা যায়নি। জামায়াত, ছাত্র-আন্দোলনের একাংশ এবং বিএনপির নিজস্ব ঘাঁটির কিছু কণ্ঠ বলবে—হাসিনা ভারতে বসে আছেন, নদী অমীমাংসিত, তারপরও মোদীকে ইংরেজিতে শুভেচ্ছা মানে নরম হওয়া। তারেক রহমানকে তাই একইসঙ্গে দিল্লিকে বিচ্ছিন্ন না দেখাতে হয় এবং ঘরোয়াভাবে ‘হাসিনা-মডেলের ভারতপ্রীতি’র অভিযোগ এড়াতে হয়।
শুভেচ্ছাপত্র নিজে কোনো নীতি বদলায় না। এটি বলে না ভারত আর প্রতিপক্ষ নয়। এটি বলে না প্রত্যর্পণ, পানি বা বাণিজ্যে ঢাকা নতি স্বীকার করেছে।
এটি বলে শুধু এটুকু: দুই সরকার এখনো একে অপরকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সম্বোধন করতে রাজি। নভেম্বরে সফর যদি হয়, এই পোস্টকে প্রথম প্রকাশ্য করমর্দন বলা হবে। সফর পিছোলে এটি ফাঁকা শিষ্টাচার হিসেবেই থেকে যাবে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির সাম্প্রতিক সুরও সেটাই—ভারতকে ‘অন্য একটি দেশ’ হিসেবে দেখা, অতিরিক্ত ভারতমোহ থেকে বেরোনো, দ্বিপক্ষীয় সমতায় নতুন সম্পর্ক গড়া। জন্মদিনের বার্তা সেই মতবাদের সঙ্গে যায়, তার বিকল্প নয়।
আগামী ছয়-আট সপ্তাহই আসল পরীক্ষা। জাতিসংঘ সপ্তাহ, অন্য শক্তির সঙ্গে পার্শ্ব বৈঠক, এবং গঙ্গা চুক্তির আলোচনার তারিখ—এগুলোই বলে দেবে এই শুভেচ্ছা কূটনৈতিক সেতু ছিল, নাকি কেবল ক্যালেন্ডারের শিষ্টাচার।