সর্বজনীন পেনশন স্কিমে মৃত্যুর পর স্বামী, স্ত্রী বা নমিনি যে পেনশন সুবিধা পান, তার বয়সসীমা আগের ৭৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৮০ বছর করা হয়েছে। এ ছাড়া ধর্মনিরপেক্ষ স্কিমের পাশাপাশি শরিয়াহভিত্তিক পেনশন স্কিম চালুরও অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদ। সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানির কর্মীদের ‘প্রগতি’ স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং বিদেশগামী কর্মীদের জন্য ‘প্রবাস’ স্কিমের নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করা হবে।

আজ বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠক শেষে এসব তথ্য জানান কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সুরাতুজ্জামান। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্ব অনুষ্ঠিত হয় এই বৈঠকে।

বৈঠক শেষে মো. সুরাতুজ্জামান বলেন, "পেনশনার নিজে আজীবন পেনশন পাবেন। তাঁর মৃত্যুর পর স্বামী বা স্ত্রীকে ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত পেনশন–সুবিধা দেওয়া হবে। আগে এ সুবিধার বয়সসীমা ছিল ৭৫ বছর।"

তিনি আরও জানান, সরকারি কর্মচারীদের আলাদা পেনশন ও আনুতোষিকের ব্যবস্থা থাকলেও সরকারি মালিকানাধীন অনেক কোম্পানির কর্মী সেই সুবিধার বাইরে। তাই তাদের সর্বজনীন পেনশনের আওতায় আনা হচ্ছে। এ ছাড়া বিদেশে যাওয়ার আগে কর্মীদের ‘প্রবাস’ স্কিম সম্পর্কে জানানো ও নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পরিচালনা পর্ষদ সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির ইসলামিক বা শরিয়াহভিত্তিক সংস্করণ চালুর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। মো. সুরাতুজ্জামান বলেন, "এ স্কিমের কাঠামো ও পরিচালনপদ্ধতি নির্ধারণে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও স্থানীয় পরামর্শকেরা কাজ করছেন। অ্যাকচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণসহ প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে আলাদা বিধিমালা প্রণয়নের পর শরিয়াহভিত্তিক স্কিম চালু করা হবে।"

বৈঠকে ৬০ বছর থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর বয়সে পেনশন দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হলেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বর্তমানে পেনশন শুরুর বয়স ৬০ বছর। মো. সুরাতুজ্জামান উদাহরণ দিয়ে জানান, বিভিন্ন দেশে পেনশন শুরুর বয়স ৬২, ৬৬ বা ৬৭ বছর। বাংলাদেশেও মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। তাই ৫৫ বছর বয়সে পেনশন দেওয়ার প্রস্তাবটি আর্থিক ও জনমিতিক বাস্তবতা বিবেচনা করে পর্যালোচনা করা হবে। অ্যাকচুয়ারিয়াল পরামর্শ নিয়ে বিষয়টি পরে আবার পরিচালনা পর্ষদে উপস্থাপন করা হতে পারে।

সর্বজনীন পেনশন তহবিল থেকে অংশগ্রহণকারীদের ঋণ দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ঋণ দেওয়া হলে তহবিলের কাঙ্ক্ষিত রিটার্ন নিশ্চিত করা এবং অংশগ্রহণকারীরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, তা বিবেচনায় নিয়ে অ্যাকচুয়ারিয়াল নির্দেশনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

পেনশন কর্মসূচির সঙ্গে স্বাস্থ্যবিমা চালুর বিষয়টিও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কোন মডেলে এটি চালু করা হবে এবং এতে তহবিলের ওপর কী ধরনের আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে মুনাফা দেওয়ার বিষয়েও এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

বিদ্যমান পেনশন–ব্যবস্থায় একবার কোনো কর্মসূচিতে ঢুকলে আর বের হওয়ার সুযোগ নেই। কেউ চালিয়ে নিতে না পারলে জমা টাকা ‘মার’ যেত। এ নিয়ম বদল করার দাবি ছিল গ্রাহকদের দিক থেকে। বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে নিয়ম বদলের প্রস্তাব ছিল। পাঁচ বছর অর্থ জমা দেওয়ার পর শারীরিক বা আর্থিক কারণে অক্ষম হয়ে পড়লে পেনশনগ্রহীতাকে বিশেষ বিবেচনায় অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া নিয়ে আলোচনা হলেও এ প্রস্তাব পাস হয়নি বৈঠকে।

সর্বজনীন পেনশনে নতুন নিবন্ধন বাড়ানোর লক্ষ্যে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রণোদনা বাড়ানো হয়েছে। নিবন্ধনের জন্য আগে ১৫ টাকা দেওয়া হলেও এখন তা বাড়িয়ে ২৫ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের আর্থিক কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ করতে সরকারি নিরীক্ষার পাশাপাশি একটি বেসরকারি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্ম দিয়ে নিরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।