কৃষিকে আরও নির্ভুল ও ফলপ্রসূ করতে আবহাওয়ার পূর্বাভাস, মাটির পিএইচ পরীক্ষা, বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার তথ্য, মোবাইলভিত্তিক সেবা এবং স্যাটেলাইট প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য। এসব তথ্য কাজে লাগিয়ে চাষাবাদের সময় নির্ধারণ, সার ও পানির সঠিক ব্যবহার এবং রোগবালাইয়ের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তবে ঝিনাইদহ জেলায় এই প্রযুক্তিগুলো এখনও অধিকাংশ কৃষকের নিয়মিত চাষাবাদ ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে জেলার স্মার্ট কৃষি এখনও মূলত অনুমানের ওপর নির্ভর করে চলছে।

সরেজমিনে কালীগঞ্জের কৃষক ইসরাইল হোসেন ডাবলুর উদাহরণ এ বিষয়ে স্পষ্ট। বৃষ্টির মধ্যেই তিনি সবুজ ধানের চাষে কীটনাশক ছিটাচ্ছিলেন। কৃষি কর্মকর্তারা বৃষ্টির সময় কীটনাশক প্রয়োগ করলে এর কার্যকারিতা কমে যায় বলে সতর্ক করলেও, ডাবলুর বিশ্বাস, বৃষ্টির মধ্যে স্প্রে করলে ধানের উপকার বেশি হবে। এমনটি করার কারণে তার ধারণা কোনো ব্যতিক্রম নয়। ঝিনাইদহের বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাষাবাদের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় খালি চোখে দেখা জমির অবস্থা, আকাশের মেঘ এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে। কখন সার বা সেচ দেওয়া উচিত বা কীটনাশক ব্যবহার করা নিরাপদ— এসব বিষয়ে প্রযুক্তিনির্ভর তথ্যের চর্চা এখনও সীমিত।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ঝিনাইদহে মোট আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার ৮০২ হেক্টর। এসব জমিতে চাষাবাদ করেন প্রায় ৩ লাখ ৫৫ হাজার কৃষক পরিবার। জেলায় মোট কৃষকের সংখ্যা ৭ লাখ ৯২ হাজার ২৩১ জন। বিপুল এই কৃষক জনগোষ্ঠীর কাছে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির সুযোগ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এখনও রয়েছে বড় ধরনের ঘাটতি।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঝিনাইদহে ২ হাজার ৫৩টি মাটির নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে বলে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে। মাটির পিএইচ নির্ণয়ের যন্ত্র এবং বৃষ্টিপাত পরিমাপের জন্য রেইন গেজ রয়েছে। তবে মাঠের মাটিতে কতটুকু আর্দ্রতা রয়েছে, তা সরাসরি পরিমাপের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্র নেই। ফলে কখন সেচ প্রয়োজন বা জমিতে বিদ্যমান আর্দ্রতা ফসলের জন্য যথেষ্ট কি না, এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান অবস্থা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নিতে হচ্ছে।

কৃষকদের ভাষ্য, সার, সেচ ও কীটনাশক ব্যবহারে তাদের প্রধান ভরসা দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা। জমির মাটিতে কোন পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি রয়েছে কিংবা কতটুকু পানি প্রয়োজন, তা পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা এখনও কম। এতে কোনো কোনো জমিতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার বা পানি ব্যবহারের আশঙ্কা থাকে। আবার প্রয়োজনীয় উপকরণ সঠিক সময়ে প্রয়োগ না করায় কোথাও ফলনও ঝুঁকিতে পড়ে।

আবহাওয়ার পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। কখনও টানা বৃষ্টি, আবার কখনও দীর্ঘ সময় বৃষ্টির দেখা নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা। ফলে অতীতের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে করা অনেক হিসাবও এখন সবসময় কাজে আসছে না। বৃষ্টির আগে সার বা কীটনাশক প্রয়োগ, অতিরিক্ত সেচ কিংবা ভুল সময়ে জমিতে বিভিন্ন কৃষি কার্যক্রম পরিচালনার কারণে বাড়তে পারে উৎপাদন ব্যয় ও লোকসানের ঝুঁকি।

তবে ঝিনাইদহের কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার একেবারেই নেই, এমন নয়। কৃষি বিভাগ ও কৃষকদের উদ্যোগে পলিসেটে ও কোকোপিটে চারা উৎপাদন, ড্রাগন ফল চাষে আলোক প্রযুক্তি, পেঁয়াজ সংরক্ষণাগার, সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচব্যবস্থা এবং হারভেস্টারের মতো প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। জৈব সার ব্যবস্থাপনায় ভার্মি কম্পোস্ট ও ট্রাইকো কম্পোস্ট ব্যবহারের চর্চাও রয়েছে।

এছাড়া কৃষকদের কৃষি তথ্য ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য কৃষি বাতায়ন, আইকৃষিসহ বিভিন্ন ডিজিটাল সেবাও চালু রয়েছে। এসব প্ল্যাটফর্মে আবহাওয়া, ফসল ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি বিষয়ে তথ্য পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কৃষি আবহাওয়া তথ্যসেবার মাধ্যমে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার পূর্বাভাসের পাশাপাশি ফসলভিত্তিক করণীয় সম্পর্কেও পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এসব তথ্য মাঠের কৃষক কতটা নিয়মিত ব্যবহার করছেন। কারণ তথ্যসেবা চালু থাকলেও তা কৃষকের প্রতিদিনের চাষাবাদের সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলছে, সেটিই প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির বাস্তব চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক।

কালীগঞ্জের বেজপাড়া গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন, "আমরা সাধারণত জমির অবস্থা আর আকাশ দেখে কাজ করি। কখন বৃষ্টি হবে, সেটা আগে থেকে নিশ্চিতভাবে জানতে পারি না। বৃষ্টি হয়ে গেলে অনেক সময় দেওয়া সার নষ্ট হয়ে যায়। মাটিতে কতটুকু পানি আছে, সেটাও মেপে চাষ করার সুযোগ নেই। তাই অভিজ্ঞতা থেকেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়।"

মহেশপুরের কৃষক কবির হোসেন বলেন, "আবহাওয়ার তথ্য আগে থেকে জানা গেলে জমিতে কাজের সময় নির্ধারণ করা সহজ হয়। কিন্তু তারা নিয়মিত এসব তথ্য নিয়ে চাষাবাদ করেন না। অনেক সময় বৃষ্টি হবে কি না বোঝার আগেই সার বা কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয়।"

কোটচাঁদপুরের কুশনা গ্রামের কৃষক হেলাল উদ্দিন বলেন, "আগের মতো আবহাওয়ার হিসাব এখন সবসময় মেলে না। কখন বৃষ্টি হবে কিংবা কখন বেশি গরম পড়বে, তা বোঝা কঠিন। ফলে অনেক সময় অনুমান করেই জমিতে কাজ করতে হয়। প্রযুক্তির তথ্য সহজে ও নিয়মিত পাওয়া গেলে কৃষকের অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হতো।"

কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহবুব আলম রনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "কালীগঞ্জে একটি মিনি আবহাওয়া স্টেশন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেটি স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। তবে বৃষ্টিপাত পরিমাপের যন্ত্র রয়েছে। বৃষ্টির সময় কতটুকু বৃষ্টিপাত হয়েছে, সেই তথ্য সংগ্রহ করে কৃষকদের জানানো হয় এবং প্রতিদিন বিকেলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরেও তথ্য পাঠানো হয়। স্মার্ট কৃষিসংক্রান্ত অন্যান্য তথ্য ও পরামর্শও কৃষকদের জানানো হচ্ছে।"

ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. আনিসুজ্জামান খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদে ফসলভেদে কৃষকদের বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হয়। সঠিক সময়ে এসব তথ্য কাজে লাগানো গেলে সার, সেচ ও বালাইনাশকের ব্যবহার আরও কার্যকর করা সম্ভব। কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে কৃষি বিভাগ কাজ করছে।"

তিনি বলেন, "স্মার্ট কৃষির লক্ষ্য শুধু কৃষি যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানো নয়, বরং তথ্যের ভিত্তিতে কৃষককে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা। এ জন্য আবহাওয়া, মাটি ও ফসলের তথ্য সমন্বিতভাবে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি।"

ঝিনাইদহে আবাদি জমির পরিমাণ ও কৃষক পরিবারের সংখ্যা বড় হওয়ায় প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির বিস্তারের সম্ভাবনাও ব্যাপক। তবে শুধু আধুনিক যন্ত্র সরবরাহ করলেই স্মার্ট কৃষি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। মাঠপর্যায়ে মাটির আর্দ্রতা পরিমাপের সুযোগ, সহজবোধ্য আবহাওয়া তথ্য, ফসলভিত্তিক তাৎক্ষণিক পরামর্শ এবং ডিজিটাল কৃষিসেবার নিয়মিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলেই কৃষকের অনুমানের চাষ ধীরে ধীরে তথ্যনির্ভর চাষাবাদে রূপ নিতে পারে।