ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের আটতলা ভবনে অগ্নিকাণ্ডের পরও ঘটনাস্থল পরিদর্শন না করেই চলে গিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন। তিনি একই সাথে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সকালে তার সফরসূচি অনুযায়ী হাসপাতাল পরিদর্শনের কথা থাকলেও, বেলা ১১টা ১০ মিনিটে গাড়িবহর পৌঁছানোর পর তিনি সরাসরি প্রশাসনিক ভবনে যান এবং রুদ্ধদ্বার বৈঠকে অংশ নেন।

প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর থেকে জারি করা সফরসূচি অনুযায়ী, সকাল পৌনে ১০টায় তার উপস্থিতির কথা ছিল। তবে হাসপাতালের উপপরিচালক জাকিউল ইসলামসহ চিকিৎসক নেতারা তাকে স্বাগত জানান। এ সময় পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহা. জাকির হোসেন অসুস্থতার কারণে উপস্থিত ছিলেন না। বৈঠকে ময়মনসিংহ সদর আসনের সংসদ সদস্য ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সহসভাপতি আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও চিকিৎসক নেতারা উপস্থিত ছিলেন। দুপুর ১২টা ২২ মিনিটে বৈঠক শেষে বের হওয়ার সময় সাংবাদিকদের কাছে তিনি বলেন, "হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে কীভাবে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত করা যায়, বৈঠকে সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।"

অগ্নিকাণ্ড ও হতাহতের বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ উত্তর দেন। পদদলিত হয়ে মৃত্যুর অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "পাড়া লেগে (পদদলিত হয়ে) কেউ মারা যায়নি। তারা আগুন আতঙ্কে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে মারা গেছে।" তিনি আরও জানান, ছয়জনের মৃত্যুর খবরের মধ্যে একজন এখনো চিকিৎসাধীন। "ছয়জনের মৃত্যুর খবর আমরা মিথ্যা প্রমাণিত করেছি। মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজনের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে এবং দুজন মারা গেছেন আগুনের আতঙ্কে। কোনো পদদলিত হয়ে মৃত্যু হয়নি। পদদলিতও না, অগ্নিদগ্ধও না।" তবে পরিবারের পক্ষ থেকে পদদলিত হয়ে মৃত্যুর দাবি করা হচ্ছে—এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, "বিষয়টি তদন্ত করতে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শেষ হলে এ বিষয়ে উত্তর দেওয়া যাবে।"

প্রতিমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের কথা নিশ্চিত করে বলেন, "তদন্ত শেষে প্রকৃত তথ্য বের হলে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব। আপনারা দোয়া করেন, যেন সবকিছু ভালো থাকে।" রোগীর চাপ ও যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "এসব সমস্যার সমাধান এক দিনে সম্ভব নয়। আমরা চেষ্টা করছি। ভবিষ্যতে কী করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পরবর্তীতে একটি বড় সভা করা হবে। এ সমস্যা থেকে বের হয়ে আসার জন্য কী কী পরিকল্পনা দরকার, তা তৈরি করতে প্রকৌশলীদের বলা হয়েছে। তারা পরিকল্পনা জমা দিলে বিস্তারিত বলতে পারব। এখন তো আমি নিজেই জানি না, বলব কীভাবে।"

এদিকে, ১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টার দিকে হাসপাতালের নতুন ভবনের ৮ তলায় লিফটের কন্ট্রোল রুম অতিরিক্ত গরম হয়ে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয় বলে ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক ধারণা। প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন ও ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে আসে। ঘটনার দিন রাতেই পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কমিটিতে প্রধান করা হয় হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. গোলাম রহমানকে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন—হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান, ময়মনসিংহ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাস, গণপূর্ত বিভাগের আওতাধীন নেত্রকোনার কেন্দুয়ার উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (ই/এম) মো. মাজেদুর রহমান এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ময়মনসিংহের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী।

লিফট রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্ব গণপূর্ত অধিদপ্তরের হাতে থাকায়, তদন্ত কমিটিতে গণপূর্ত বিভাগের দুজন কর্মকর্তাকে রাখায় জনমনে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সচেতন মহল। সমালোচনার মুখে মঙ্গলবার আগের পাঁচ সদস্যের কমিটি বাতিল করে নতুন ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এতে ময়মনসিংহ গণপূর্ত বিভাগের দুই কর্মকর্তার নাম বাদ দেওয়া হয়। পুনর্গঠিত নতুন কমিটিতে মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. গোলাম রহমানকে সভাপতি ও সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খানকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। অন্য সদস্যরা হলেন—সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ময়মনসিংহের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ (দক্ষিণ)-এর নির্বাহী প্রকৌশলী, ডেন্টাল সার্জন ডা. মোহাম্মদ খন্দকার মো. আনোয়ার হোসেন এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ময়মনসিংহের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী।

ছয় সদস্যের এই কমিটিকে অগ্নিকাণ্ডের কারণ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কারও গাফিলতি শনাক্তকরণ, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে করণীয় এবং ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণসহ সার্বিক বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এদিকে অগ্নিকাণ্ডের পরদিন মঙ্গলবার পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করে জেলা প্রশাসন। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আসাদুজ্জামানকে আহ্বায়ক করে গঠিত পাঁচ সদস্যের এই কমিটিকে অগ্নিকাণ্ডের কারণ, ক্ষয়ক্ষতি ও সার্বিক ঘটনা তদন্ত করে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।