দেশে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মুডিসের মতো আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ণয়কারী সংস্থা বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস বাড়িয়েছে, যা একটি ইতিবাচক সংকেত। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা সাধারণত এসব সংস্থার মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেয়, ফলে এটি দেশের অর্থনীতি ও বিনিয়োগ পরিবেশে আস্থার সৃষ্টি করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাতে সহায়ক হতে পারে।
বর্তমানে মূল্যস্ফীতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে থাকলেও সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূচকে উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ব্যালান্স অব পেমেন্টের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। তবে জ্বালানিসংকট নতুন কোনো বিষয় নয়; কয়েক বছর ধরেই এটি চলমান। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে এর যুক্ত হওয়ায় সংকট আরও গভীর হয়েছে। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যাগুলো বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব ফেলেছিল, যা বাংলাদেশকে এক ধরনের ভাবমূর্তি সংকটে ফেলছিল। এমন পরিস্থিতে মুডিসের পূর্বাভাস বৃদ্ধি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এই পূর্বাভাসকে চূড়ান্ত অর্জন হিসেবে দেখা উচিত নয়। ফিচ এবং এসঅ্যান্ডপি-র মতো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ণয়কারী সংস্থাগুলোর কাছে বাংলাদেশের পূর্বাভাস এখনো নেতিবাচক। তাই শুধুমাত্র একটি সংস্থার পূর্বাভাস বৃদ্ধিতে সন্তুষ্ট না থেকে অন্য সংস্থাগুলোর মূল্যায়নেও উন্নতি আনার জন্য কাজ করতে হবে।
ঋণমানের পূর্বাভাসের উন্নতি এবং প্রকৃত ঋণমানের উন্নতি দুটি ভিন্ন বিষয়। পূর্বাভাসের পরিবর্তন ইতিবাচক সংকেত দিলেও দীর্ঘমেয়াদে ঋণমান উন্নত করতে হলে অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতা দূর করতে হবে। বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং চলমান সংস্কার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা অপরিহার্য।
বাংলাদেশের বর্তমান উন্নয়ন পর্যায়ে এবং ভবিষ্যতের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে শুধুমাত্র প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক অর্থায়নের প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে দেশের বিনিয়োগ অর্থায়নের বড় অংশ ব্যাংক খাত থেকে আসে। অবকাঠামো, জ্বালানি, শিল্প ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা ব্যাংকঋণ দিয়ে মেটানো কঠিন। তাই বৈশ্বিক অর্থায়নের নতুন উৎস সৃষ্টি করা জরুরি।
বৈশ্বিক অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে ঋণমান একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পেতে ঋণমানকে গুরুত্ব দেন। ফলে ঋণমান উন্নত হলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।
তবে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে এবং চলমান সংস্কার কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে। সংস্কারের ক্ষেত্রে স্পষ্ট সময়সীমা ও রূপরেখা থাকা জরুরি—কত দিনের মধ্যে কোন সংস্কার বাস্তবায়ন করা হবে, তার পরিষ্কার ছবি থাকতে হবে। ধাপে ধাপে সংস্কার বাস্তবায়ন করলে অর্থনীতির মৌলিক সক্ষমতা বাড়বে এবং ঋণমান উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি হবে। ঋণমান উন্নত হলে দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক অর্থায়ন পাওয়া সহজ হতে পারে।
মাসরুর রিয়াজ: চেয়ারম্যান, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ