বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমানের পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ থেকে পুনরায় ‘স্থিতিশীল’ করেছে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা মুডিস রেটিংস। রাজনৈতিক অস্থিরতা হ্রাস, বহিঃখাতের চাপ কমা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং প্রবাসী আয়ের রেকর্ড প্রবাহকে এই পরিবর্তনের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
আজ প্রকাশিত সর্বশেষ মূল্যায়নে মুডিস জানিয়েছে, "নির্বাচন–পরবর্তী রাজনৈতিক রূপান্তর এবং নতুন সরকারের প্রতি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমর্থনের কারণে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় সংস্কার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার ঝুঁকি কমেছে।"
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে ধারাবাহিক প্রতিশ্রুতি এবং অন্যান্য সংস্থার সহযোগিতা অর্থায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের মার্চে সম্পদের মানের অবনতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে ব্যাংক খাতের অনিশ্চয়তা দেখিয়ে বাংলাদেশের ঋণমান ‘বি-ওয়ান’ থেকে কমিয়ে ‘বি-টু’তে নামিয়েছিল মুডিস।
বর্তমানে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ইস্যুয়ার ও সিনিয়র আনসিকিউরড রেটিং ‘বি২’ এবং স্বল্পমেয়াদি ইস্যুয়ার রেটিং ‘নট প্রাইমে’ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এর ফলে বিদেশি ব্যাংকগুলো বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর জন্য নির্ধারিত ঋণসীমা বাড়াবে, যা আমদানি প্রক্রিয়াকে সহজতর করবে।
মুডিসের রেটিংয়ের প্রভাব বিষয়ে ওয়ান ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহিত রহমান বলেন, "মুডিসের রেটিংকে বিশ্বের বড় ঋণদাতারা বেশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। আমদানি করার জন্য আমাদের বিদেশি ব্যাংকগুলো থেকে ঋণসীমা প্রয়োজন হয়। মুডিসের রেটিং কমে গেলে ঋণসীমা কমিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে বিদেশি ব্যাংকগুলো ডলারের ঋণসীমা আবার বাড়াতে শুরু করবে। এতে আমরা আরও সহজে ঋণপত্র খুলতে পারব। ডলারের সরবরাহ বাড়লে খরচেও প্রভাব পড়তে পারে।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন, "বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এ সময়ে যা খুবই ইতিবাচক। এখন মূলধনি যন্ত্রপাতির পাশাপাশি কাঁচামাল আমদানি বাড়বে। এতে বাড়বে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহও। বন্ধ কলকারখানা চালু হলে অর্থনীতিতে গতি ফিরবে। এতে কর্মসংস্থান হবে এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধিও বাড়বে।"
মুডিসের তথ্যমতে, বৈধ চ্যানেলে রেকর্ড প্রবাসী আয় এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হারের মতো সংস্কারের ফলে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি রিজার্ভ বেড়ে প্রায় ৩২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা চার মাসের বেশি আমদানির ব্যয় মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত। ২০২৪ সালে এই রিজার্ভ ছিল ২১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল সাড়ে ৩ শতাংশ, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেড়ে ৪ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২৬-২৭ সালে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭-২৮ সালে শিল্প খাতের বিনিয়োগ স্বাভাবিক হলে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৯ শতাংশ স্পর্শ করতে পারে। তবে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের আশেপাশে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার কারণে রেটিং ‘বি২’–তে রাখা হয়েছে, যেখানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ। মুডিসের মতে, ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণে জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ অর্থ পুনর্মূলধনীকরণ প্রয়োজন হতে পারে, যা সীমিত রাজস্ব আয়ের কারণে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বার্ষিক ১২ শতাংশ আমানত বৃদ্ধি প্রমাণ করে যে, সমস্যা তারল্যের নয় বরং খেলাপি ঋণজনিত মূলধনের সংকট।
এছাড়া, জিডিপির অনুপাতে সর্বনিম্ন রাজস্ব সংগ্রহকারী দেশ হওয়ায় সরকারের আর্থিক নমনীয়তা সীমিত। মোট রাজস্বের প্রায় ৩০ শতাংশ ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়। ঝুঁকি হিসেবে মুডিস এলএনজি টার্মিনাল-বিভ্রাটের কারণে বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে আসার ফলে রপ্তানি সক্ষমতা ও অর্থায়নে সম্ভাব্য চাপের কথা উল্লেখ করেছে।