শরীয়তপুরের নড়িয়া পৌরসভার অফিস সহায়ক পদে নিয়োজিত দুই নারী কর্মচারীকে দাপ্তরিক কাজের পরিবর্তে প্রশাসকের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে। অনীহা প্রকাশ করলে তাদের চাকরিচ্যুতির হুমকি দেওয়া হয় বলেও জানা গেছে। এই অভিযোগের তীর নড়িয়া পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) লাকি দাস এবং পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার ফিরোজ আহমেদের বিরুদ্ধে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, পৌরসভার অফিস সহায়ক রিতা রানী প্রতিদিন সকালে পৌরসভা কার্যালয়ে হাজিরা দেওয়ার পর সরাসরি যান প্রশাসকের বাসায়। সেখানে কয়েক ঘণ্টা অবস্থানের পর দুপুর ১টার দিকে তিনি আবার পৌরসভা কার্যালয়ে ফিরে আসেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) লাকি দাস নড়িয়া পৌরসভার প্রশাসকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই অফিস সহায়ক রিতা রানীকে নিয়মিত এবং অপর অফিস সহায়ক নাসিমা বেগমকে মাঝেমধ্যে প্রশাসকের বাসায় কাজ করতে পাঠানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিষয়টি যাচাই করতে মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদক নড়িয়া পৌরসভা কার্যালয়ে গিয়ে অফিস সহায়ক রিতা রানীর সাথে দেখা করেননি। তবে পৌরসভার কয়েকজন কর্মচারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রিতা রানী প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে অফিসে এসে হাজিরা দেন। এরপরই তিনি পৌর প্রশাসকের বাসায় চলে যান। প্রশাসকের বাসায় কাজ শেষ করে প্রতিদিন দুপুর ১টার দিকে তিনি আবার পৌরসভা কার্যালয়ে ফিরে আসেন।

সরেজমিনে বিষয়টি যাচাই করতে রিতা রানীর জন্য অপেক্ষা করা হয়। পরে দুপুর ১টার দিকে তাকে পৌরসভা কার্যালয়ে ঢুকতে দেখা যায়। এ সময় তার সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, তিনি প্রশাসকের বাসা থেকেই ফিরেছেন। সপ্তাহে কত দিন এভাবে কাজ করতে হয়—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "প্রতিদিনই যেতে হয়। না গেলে চাকরি থাকবে না।"

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পৌরসভার এক কর্মচারী অভিযোগ করেন, অফিস সহায়ক পদে নিয়োজিত কর্মচারীদের ব্যক্তিগত বাসার কাজে পাঠানো হচ্ছে। এতে একদিকে দাপ্তরিক কাজে বিঘ্ন ঘটছে, অন্যদিকে কর্মচারীদের মধ্যে চাকরি হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ওই কর্মচারীর দাবি, প্রতিদিন রিতা রানীকে প্রশাসকের বাসায় পাঠানো হয়। তিনি যেতে না চাইলে চাকরি চলে যাওয়ার ভয় দেখানো হয়। অনেক সময় রিতা রানী ও নাসিমা বেগম—দুজনকেই একসঙ্গে বাসায় কাজ করতে যেতে হয়।

এ বিষয়ে জানতে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার ফিরোজ আহমেদ ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেন, "প্রশাসক ছোট একটি মেয়েকে নিয়ে একা থাকেন। তার বাসায় স্থায়ী গৃহকর্মী থাকলেও মাঝেমধ্যে প্রশাসকের অনুরোধে রিতা রানীকে শিশুটির দেখাশোনার জন্য পাঠানো হয়। তবে চাকরিচ্যুত করার হুমকির অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।"

অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌর প্রশাসক লাকি দাসও ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে তিনি স্বীকার করেন, মাঝেমধ্যে রিতা রানীকে তার বাসায় নেওয়া হয়। তিনি বলেন, "তিনি ছোট একটি সন্তানকে নিয়ে একা থাকেন। বাসায় স্থায়ী গৃহকর্মী থাকলেও প্রয়োজনের সময় রিতা রানীকে মেয়ের দেখাশোনার জন্য ডাকা হয়।"

অফিসের কর্মচারীকে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা বিধিসম্মত কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "এটি নিয়মসম্মত নয়। তবে পরিস্থিতির কারণে মাঝেমধ্যে এমনটি করতে হয়েছে। সাংবাদিকদের আপত্তির পর তিনি ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ আর করাবেন না বলেও জানান।"

নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল কাইয়ুম খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "বিষয়টি মানবিক দিক থেকেও দেখা যেতে পারে। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) একা থাকেন এবং তার ছোট সন্তান রয়েছে। তবে পৌরসভা উপজেলা প্রশাসনের অধীন নয়। সে কারণে এ বিষয়ে তিনি আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে চান না। তবে সহকর্মী হিসেবে ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেবেন বলে জানান।"