চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের পদার্পণ বন্ধ হয়েছিল। এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের পেছনে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুলের ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়। সাম্প্রতিক সময়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশের পর, সাবেক এই উপদেষ্টা নিজের অবস্থান আরও পরিষ্কার করেছেন এবং ঘটনার তদন্ত ও প্রকাশের পেছনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বিশ্বকাপ বয়কটের কারণ উদ্ঘাটনের জন্য তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। আজ জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কমিটির প্রধান যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. এ কে এম ওয়ালী উল্লাহ ২২ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। কমিটির অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিসিবির বর্তমান প্রধান নির্বাচক ও সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক হাবিবুল বাশার এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর।

প্রতিবেদনে লিখিতভাবে স্পষ্টভাবে কার দায় তা উল্লেখ না থাকলেও, সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে জানানো হয় যে, বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল অধ্যাপক আসিফ নজরুলের। প্রতিবেদনের ১৯ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে, এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কোনো একজন ব্যক্তির নেওয়া উচিত নয়। তবে ‘একজন ব্যক্তি’ কে তা লিখিতভাবে পরিষ্কার না করলেও, সংবাদ সম্মেলনে ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর বলেন, ‘এই একজন’ বলতে তারা তখনকার ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকেই বুঝিয়েছেন। অন্যদিকে, দায়ের বিষয়ে ওয়ালী উল্লাহ বলেন, ‘এটা সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল। এর বাইরে আর কী বলব!’

প্রতিবেদন প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে নিজের অবস্থান ব্যক্ত করেন সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। তিনি লেখেন, ‘ভারতে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলতে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি তখনকার ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে মূলত আমারই ছিল। আমি নিজেই এ কথা একাধিকবার প্রকাশ্যে বলেছি। তাই এত দিন পর ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক বিষয়টি ঘটা করে তদন্ত করে তা প্রকাশের কী এমন কারণ ঘটল বুঝলাম না।’

আসিফ নজরুল তার পোস্টে সিদ্ধান্তের পটভূমি তুলে ধরেন। তিনি লেখেন, ‘ঘটনার সূত্রপাত উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের চাপের মুখে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নির্দেশে মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে অপমানজনকভাবে বাদ দেওয়া থেকে। এর পরপরই আমরা নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা এবং বাংলাদেশের প্রতি অবমাননার প্রতিবাদে ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার বিষয়ে অনীহা জানাই।’

নিজের আশঙ্কার পক্ষে আইসিসির প্রতিবেদনের উদাহরণ দিয়ে তিনি আরও লেখেন, ‘আমাদের আশঙ্কা যে অমূলক ছিল না, আইসিসির প্রথম রিপোর্টেই তার স্বীকৃতি ছিল। সেখানে ভারতে নিরাপত্তা-আশঙ্কার তিনটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছিল, বিশ্বকাপের দলে মোস্তাফিজ থাকলে, বাংলাদেশের সমর্থকরা মুক্তভাবে ঘোরাফেরা করলে এবং বাংলাদেশে নির্বাচন এগিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে। বিবিসি বাংলা ওই রিপোর্টের হুবহু বাংলা অনুবাদও প্রকাশ করেছিল। এই পরিস্থিতিতে আমরা ভারতে খেলতে যাব কেন?’

অন্য কোনো ভেন্যুতে খেলার চেষ্টার কথা উল্লেখ করে সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা শেষ পর্যন্ত অন্য কোনো ভেন্যুতে বিশ্বকাপ খেলার জন্য বহু চেষ্টা করেছি। কোনো কোনো দেশ থেকে সমর্থনও পেয়েছিলাম। কিন্তু হয়তো আইসিসির নেতৃত্বে ভারতীয়দের আধিপত্যে থাকার কারণে শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমাদেরকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও কোনো যোগাযোগ করা হয়নি।’

সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনের যুক্তি তুলে ধরে তিনি লেখেন, ‘আমার সিদ্ধান্তের পেছনে তিনটি বিষয় ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার, দেশের মর্যাদা, আমাদের ক্রিকেটার-সাংবাদিক-সমর্থকদের নিরাপত্তা এবং আগামী নির্বাচনের আগে দেশের পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা। সে সময় বলা হয়েছিল, বিশ্বকাপ না খেললে বিদেশি দলগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের খেলা বন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের ক্রিকেট বোর্ডের নানা উদ্যোগে সেই আশঙ্কাও শেষ পর্যন্ত দূর হয়েছিল।’

নিজের নেওয়া সিদ্ধান্তকে সঠিক দাবি করে আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমি মনে করি, আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। একটি ছোট দেশ বলে কেউ আমাদের ইচ্ছেমতো অপমান করবে, আর আমরা সবসময় তা মুখ বুঝে মেনে নেব এমন প্রত্যাশা করা ঠিক নয়। আমি সমমর্যাদার ভিত্তিতে ভারতের সাথে বন্ধুত্বে বিশ্বাসী, মাথা নত করে সব মেনে নেয়াতে না।'