জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয়, দেশে স্বামী বা সঙ্গীর হাতে পারিবারিক সহিংসতা কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নারী নির্যাতনের অভিযোগে জরুরি সেবায় মোট ২৭ হাজার ৯১১টি অভিযোগ আসে। এর মধ্যে ১৭ হাজার ১৯৬টিই স্বামীর বিরুদ্ধে, অর্থাৎ ৬২ শতাংশ নির্যাতনের অভিযোগই স্বামী বা সঙ্গীর বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছে। আমাদের সমাজে পারিবারিক সহিংসতাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া এবং একে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার এই বাস্তবতা ঘটনাগুলো বাড়ার প্রধান কারণ। একই সঙ্গে, নারী নির্যাতনের মামলায় বিচারহীনতার যে দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে, তা পরিস্থিতিকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলেছে।
সম্প্রতি মুক্তা ইসলাম ও আল মাইদা আক্তার নামের দুজন নারী স্বামীর হাতে নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হন। উভয় ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়। বেসরকারি সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যের বরাতে মুক্তকণ্ঠের খবর জানাচ্ছে, গত আট মাসে পারিবারিক সহিংসতার ২৮৪টি খবর প্রকাশ্যে এসেছে। এর মধ্যে মামলা হয়েছে ১১৯টি ঘটনায়। ভুক্তভোগী নারীদের ১০৮ জন স্বামীর হাতে হত্যার শিকার হন। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান বলছে, দেশে পারিবারিক সহিংসতার ৫৬০টি ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছিল। মামলা হয়েছিল ২৪৮টি। স্বামীর হাতে ২১৭টি হত্যা ও ২৮টি নির্যাতনের ঘটনা ছিল।
গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের যৌথ জরিপের ফলাফলে পারিবারিক সহিংসতার উদ্বেগজনক একটি চিত্র পাওয়া যায়। জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, প্রায় ৭০ শতাংশ নারী তাঁদের জীবদ্দশায় জীবনসঙ্গী বা স্বামীর হাতে অন্তত একবার হলেও শারীরিক, যৌন, মানসিক ও অর্থনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন।
শুধু পারিবারিক সহিংসতা নয়; সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হত্যা, ধর্ষণ, যৌন হয়রানিসহ নারী নির্যাতন এবং নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এর বিপরীতে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে, মাত্র ৩ শতাংশ মামলায় সাজা হয়। এর বিপরীতে ৭০ শতাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পান। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল প্রমাণ, সাক্ষীর অনুপস্থিতি ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
দুঃখজনক হলেও সত্যি, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় বছরের পর বছর ধরে এই বিচারহীনতা চললেও বিচারব্যবস্থার এই দুর্বলতা কাটাতে রাষ্ট্রের দিক থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আমরা মনে করি, পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবই এই অনীহার পেছনে প্রধানভাবে দায়ী। এই মনোভাব পরিবর্তন না করা হলে যতই কঠোর আইন করা হোক না কেন, তাতে পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হবে না।
নারীর প্রতি সহিংসতা, বিশেষ করে পারিবারিক সহিংসতার যে ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে, বাস্তব ঘটনা তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি। কেননা, পারিবারিক সহিংসতাকে আমাদের সমাজে একটি গ্রহণযোগ্যতার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কেবল গুরুতর কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটলেই সেটা প্রকাশ্যে আসে।
পারিবারিক সহিংসতা হোক আর অন্য কোনো সহিংসতা হোক, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে রাষ্ট্রকে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। বিচারহীনতার বৃত্ত ভাঙতে রাষ্ট্রকে অবশ্যই শূন্য সহিষ্ণুতার নীতি গ্রহণ করতে হবে। পরিবার ও সমাজকে পারিবারিক সহিংসতাকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সময় এসেছে।