অনলাইনে ঘুষের অভিযোগ জানানোর প্ল্যাটফর্ম ‘ঘুষ.সাইট’ (ghush.site) তৈরির মাত্র ২৪ দিনেই ১৮ হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। যেখানে ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের পরিমাণ ৫৫৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ‘ঘুষ.সাইট’ তৈরি করে দেশজুড়ে আলোচনায় আসা ১৭ বছরের কিশোর শাহেদ শরীফ আহমেদ মুক্তকণ্ঠকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, গত ২১ আগস্ট ‘ঘুষ.সাইট' ওয়েবসাইটটি চালুর পর ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জমা পড়েছে ১৮ হাজার ৮৯৯ অভিযোগ। যেখানে ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের পরিমাণ ৫৫৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এর মধ্যে ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন সরকারি অফিসগুলোতে ঘুষ দাবি করা হয়েছে এমন অভিযোগ পড়েছে ১ হাজার ১৯৬টি। ময়মনসিংহ বিভাগের ভূমি অফিসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ পড়েছে।

শাহেদের মা আমিনা খাতুন ছিলেন ময়মনসিংহ সদরের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর অসুস্থতাজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর সময় তার চাকরির মেয়াদ ছিল ১৩ বছর।

পরিবারের ভাষ্য, আমিনা খাতুনের প্রভিডেন্ট ফান্ডে জমা ছিল প্রায় ৭ লাখ টাকা। সেই টাকা তুলতে ট্রেজারি অফিসে ১০ হাজার টাকা, জেলা শিক্ষা অফিসে ২০ হাজার টাকা এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ৮ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। পরিবারের হিসাবে, সাত লাখ টাকা পাওয়ার প্রক্রিয়ায় ৩৮ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে।

পরিবারের দাবি, আমিনা খাতুনের কল্যাণ তহবিলের দুই লাখ টাকা এবং চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যুর কারণে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়ার কথা আরও ৮ লাখ টাকা। মোট ১০ লাখ টাকা পেতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কার্যালয়ের ব্যক্তিরা আবার ১ লাখ টাকা দাবি করেছেন। টাকা না দিলে ফাইল এগোবে না বলেও জানানো হয়।

মৃত মায়ের সরকারি পাওনা টাকা তুলতে ঘুষ দিতে হয়েছিল—বাবার এমন অভিজ্ঞতা দেখে ক্ষুব্ধ হয়েছিল শাহেদ শরীফ আহমেদ। নিজের পাসপোর্ট করাতেও ঘুষ দাবির অভিজ্ঞতা হয় তার। সরকারি সেবা পেতে ঘুষ কেন দিতে হবে—এই প্রশ্ন থেকেই অনলাইনে ঘুষের অভিযোগ জানানোর প্ল্যাটফর্ম ‘ঘুষ.সাইট’ (ghush.site) তৈরি করে ময়মনসিংহের এই কিশোর।

এই সংবাদ প্রকাশ করে মুক্তকণ্ঠসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম। ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ৮ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয় বলে জানান শরীফুল ইসলাম শামীম। এরপর আলোচনা তুঙ্গে ওঠে। গত ৩১ আগস্ট ময়মনসিংহ সদর উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ের হিসাব সহকারী এ এইচ এম নাদিরুল হাসান সবুজ এবং অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মুহাম্মদ মজিবুর রহমানকে শোকজ নোটিশ দেন সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীন। তিন কার্যদিবসের মধ্যে তাদের জবাব দিতে বলা হয়।

আলোচনা-সমালোচনার ২০ দিনের মধ্যেই ৯ সেপ্টেম্বর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অফিস আদেশে সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীনকে জেলার নান্দাইল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে বদলি করা হয়। একই আদেশে নান্দাইল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন নেছাকে ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে বদলি করা হয়।

শাহেদের বাবা শরীফুল ইসলাম শামীম আগে সৌদি আরবের একটি ব্যাংকে চাকরি করতেন। ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্ট এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বাবার সঙ্গে থাকে শাহেদ। ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীনে ক্যামব্রিজ ইন্টারন্যাশনালের এ-লেভেলে পড়ছে সে। পড়াশোনার পাশাপাশি অনলাইনে ওয়েবসাইট তৈরির কাজ শিখেছে। সেই দক্ষতাই কাজে লাগিয়েছে ‘ঘুষ.সাইট’ তৈরিতে।