অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া একটি হিসাব থেকে দাবি করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে মাত্র ১৪ দিনের মতো তেল মজুত আছে। দাবিটির পক্ষে যে সরল অঙ্কটি পেশ করা হচ্ছে, তাতে বলা হয়—কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুদে (এসপিআর) বর্তমানে প্রায় ২৮ কোটি ৬৬ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আছে, আর দেশটিতে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ ব্যারেল পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য ব্যবহৃত হয়। একটিকে আরেকটি দিয়ে ভাগ করলে পাওয়া যায় প্রায় ১৪ দিন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও (এনপিআর) গত ১৬ আগস্ট জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুদ চার দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। গত মাসের শুরুতে মজুদটি ৩০ কোটি ব্যারেলের নিচে নামে; বছরের শুরুতে এটি ছিল ৪১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল। ভাইরাল দাবির যে অংশে বলা হচ্ছে এসপিআর ঐতিহাসিকভাবে নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে, সেটি ঠিকই।

তবে ঝুঁকির হিসাবটি অনেকাংশে অতিরঞ্জিত। যুক্তরাষ্ট্রের তেল সরবরাহের একমাত্র উৎস এসপিআর নয়। অনেকেই এমনভাবে সমালোচনা করেন, যেন জরুরি মজুদ ফুরিয়ে গেলেই সারা দেশে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু ওই হিসাবের মূল সমস্যা হলো, ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের সংখ্যাকে একসঙ্গে মেলানো হয়েছে। এসপিআরে থাকে অপরিশোধিত তেল; আর দৈনিক ২ কোটি ৭ লাখ ব্যারেলের যে সংখ্যাটি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি মোট পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য সরবরাহের হিসাব। এর মধ্যে পেট্রল, ডিজেল, জেট জ্বালানি ও অন্যান্য পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য রয়েছে।

তাই তুলনাটি দাঁড়িয়েছে এমন—কোনো পরিবারের জরুরি প্রয়োজনে রাখা টিনজাত খাবারের মজুতের সঙ্গে দৈনন্দিন মোট খাবারের চাহিদা মাপা হচ্ছে। সেখানে দেখা যাবে, ওই পরিবারের হাতে মাত্র ১৪ দিনের খাবার আছে; কিন্তু মুদির দোকানে থাকা পণ্য, বাড়ির ফ্রিজে রাখা খাবার এবং প্রতিদিন বাজার করে আনা খাবার হিসাবের বাইরে থেকে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের পেট্রোলিয়াম ব্যবস্থা শুধু এসপিআরের ওপর নির্ভর করে না। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশটি প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করে; বাণিজ্যিক মজুদে রয়েছে প্রায় ৪২ কোটি ৪৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল; আর শোধনাগারগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ ব্যারেল তেল পরিশোধন করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানি ও রপ্তানি করে। এসপিআর হলো দেশটির জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য রাখা তেলের মজুত, মূল তেলের ভান্ডার নয়।

এসপিআর বিশ্বের সবচেয়ে বড় জরুরি অপরিশোধিত তেলের মজুত। মার্কিন জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির উপকূলজুড়ে চারটি ভূগর্ভস্থ লবণগুহায় মোট ৭১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল তেল সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে। প্রাকৃতিক লবণের স্তরের মধ্যে থাকা বিশাল গহ্বরই লবণগুহা; সেখানে লবণ সরিয়ে তৈরি কৃত্রিম গুহায় তেল বা গ্যাস সংরক্ষণ করা হয়।

২০২০ সালের শেষ দিকে এসপিআরে প্রায় ৬৩ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল তেল মজুত ছিল। ২০২৬ সালের ২৮ আগস্ট তা কমে প্রায় ২৮ কোটি ৬৬ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। ১৯৮২ সালের নভেম্বরের পর এটিই এসপিআরের সর্বনিম্ন মজুত। ভিন্ন ভিন্ন জরুরি পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর পূর্বসূরি জো বাইডেন—দুই প্রেসিডেন্টের আমলেই এই মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ তেল ব্যবহার করা হয়েছে।

এত কিছুর পরও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের কারণ আছে, কারণ জরুরি তেলের মজুত কমছে। তবে দেশটি দুই সপ্তাহের মধ্যে তেলশূন্য হয়ে পড়ার পথে নেই। কয়েক বছর আগের তুলনায় সরকার নিয়ন্ত্রিত মজুদ ব্যবস্থায় জরুরি প্রয়োজনে রাখা অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ এখন অনেক কম। এসপিআরকে বিমা পলিসির মতো ভাবা যায়—স্বাভাবিক সময়ে কেউ বিমার টাকায় জীবনধারণ করে না, কিন্তু যুদ্ধ, অবরোধ, বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় কিংবা বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো বড় বিপর্যয়ে সেই বিমাই সুরক্ষা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি নিরাপত্তার এই ব্যবস্থা আগের তুলনায় এখন অনেক ছোট হয়ে গেছে।