আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং গোপন বন্দিশালায় নির্যাতনের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) দীর্ঘকাল ধরে বিতর্কিত। এই কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে র‍্যাব বিলুপ্তির ব্যাপক সমর্থন ছিল। গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন 'আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথ: আ স্ট্রাকচারাল ডায়াগনসিস অব এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স ইন বাংলাদেশ'-এও র‍্যাব ভেঙে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, গুম, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার এই ব্যবস্থার কেন্দ্রে ছিল র‍্যাব।

২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র এই বাহিনীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের প্রতিবেদনেও র‍্যাব বিলুপ্তির কথা বলা হয়। এই প্রেক্ষাপটে গত ১০ সেপ্টেম্বর সংসদে 'স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬' পাস হওয়াটা আশাব্যঞ্জক মনে হলেও বাস্তবে তা তেমনটি হয়নি। আইনটিতে র‍্যাব বিলুপ্তির কথা থাকলেও মূলত এর মৌলিক কাঠামো, ক্ষমতা ও কার্যাবলি অপরিবর্তিত রেখে কেবল নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। র‍্যাবের পরিবর্তে এখন এসআরবি নামে একটি নতুন এলিট বাহিনী গঠন করা হচ্ছে।

নতুন আইন অনুযায়ী, র‍্যাবের ক্ষমতা, সম্পদ, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, বিধিমালা, জনবল, তহবিল এবং নথিপত্র—সবই এসআরবি গ্রহণ করছে। নতুন বিধিমালা না আসা পর্যন্ত ২০০৫ সালের র‍্যাব বিধিমালা এসআরবির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। এটি পুলিশ বাহিনীর একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে কাজ করবে, যেখানে পুলিশ কর্মকর্তা, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য বা সরকারি কর্মচারী নিয়োগ পাবেন।

এসআরবির নিজস্ব পতাকা, প্রতীক ও পোশাক থাকবে এবং একজন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক বা তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার কর্মকর্তা এর নেতৃত্ব দেবেন। তল্লাশি, গ্রেপ্তার ও জব্দসহ আইন প্রয়োগের বিস্তৃত ক্ষমতা এবং নিজস্ব হাজতখানা ও জিজ্ঞাসাবাদের ব্যবস্থা থাকবে এই বাহিনীর। অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একটি কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষ ও সদস্যদের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ দেখবে।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছিল যে, অত্যন্ত ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে এবং সীমিত সময়ের জন্য সংসদের অনুমোদন ও পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে কেবল সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার কাজে নিয়োগ করা উচিত। বিজিবি ও ডিজিএফআইয়ের কাজ যথাক্রমে সীমান্ত নিরাপত্তা ও সামরিক গোয়েন্দা কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলা হয়েছিল। কারণ, র‍্যাব বা এসআরবির মতো বাহিনীতে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের পদায়ন করলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। কিন্তু এসআরবি আইন এসব সুপারিশের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে নতুন নাম ও পোশাকের আড়ালে এটি কার্যত র‍্যাবেরই অনুরূপ একটি বাহিনী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উদ্বেগের বিষয় হলো, র‍্যাব যে জবাবদিহিহীন ও দায়মুক্তির পরিমণ্ডলে কাজ করেছে, এসআরবিও সম্ভবত সেই একই পথে চলবে। এর পাশাপাশি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬ এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬-এর পাস হওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। নতুন আইনে মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীন রাখা হয়নি; এর সদস্য নিয়োগ ও বাজেট সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ফলে এসআরবিসহ নিরাপত্তা বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে কমিশন স্বাধীন তদন্ত করতে পারবে না।

গুমবিষয়ক নতুন আইনে মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এখন একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে অন্য একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থা তদন্ত করবে। এতে তিনটি বড় সমস্যা দেখা দিতে পারে: প্রথমত, এক রাষ্ট্রীয় সংস্থা অন্যটির বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্ত unlikely; দ্বিতীয়ত, শুরুতে কোন সংস্থা জড়িত তা জানা কঠিন হতে পারে; তৃতীয়ত, বিব্রত হওয়ার ভয়ে কোনো সংস্থাই তদন্তের দায়িত্ব নিতে চাইবে না।

পরিশেষে, এসআরবি যে আইনি কাঠামোর অধীনে কাজ করবে, তা মানবাধিকার লঙ্ঘন ঠেকানোর জন্য অনুপযুক্ত। সরকারের সদিচ্ছার কথা বলা হলেও, কেবল সদিচ্ছায় মানবাধিকার সুরক্ষা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী আইন ও জবাবদিহির প্রতিষ্ঠান। গুম, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এই তিনটি আইন যথাযথভাবে সংশোধন করার প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের।

— লেখক: ড. শরীফ ভূঁইয়া, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিজিটিং ফেলো, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য।