ফেসবুকে স্ক্রলিং করতেই সামনে এল একটি বিজ্ঞাপন। একজন বলছেন, ‘বাসায় ভরপুর মেহমান এসেছে। কিন্তু তখনই দেখলেন, চুলায় গ্যাস নাই। সমাধান নিয়ে এসেছি আমরা। ৩ থেকে ৫ গুণ বেশি চাপে গ্যাস পাবেন এখন। মাত্র একটি ছোট কম্প্রেসর বসালেই মিলবে সমাধান।’
গ্যাস-সংকটের সময় এমন প্রচারণার মাধ্যমে ফেসবুকের বিভিন্ন পেজ ও অনলাইন সাইটে বিক্রি হচ্ছে ছোট আকারের গ্যাস কম্প্রেসর বা বুস্টার। বিক্রেতাদের ভাষ্য, লাইনে অল্প অল্প গ্যাস থাকলে এসব যন্ত্র ব্যবহার করে চুলায় গ্যাসের চাপ বাড়ানো যায়। দাম দেড় থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যে। সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে এক বছর পর্যন্ত গ্যারান্টি বা সার্ভিস ওয়ারেন্টি।
ফেসবুকে এসব কম্প্রেসর বিক্রির অন্তত ৩০টি পেজের সন্ধান পেয়েছে মুক্তকণ্ঠ। দারাজের মতো অনলাইনবাজারেও এসব পণ্যের তালিকা পাওয়া গেছে। কোনো বিক্রেতা দেড় বছর ধরে, কেউ দুই বছর বা তার বেশি সময় ধরে এসব পণ্য বিক্রির কথা জানিয়েছেন। পাঁচজন বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে।
গ্যাস-সংকটের সময় এমন প্রচারণার মাধ্যমে ফেসবুকের বিভিন্ন পেজ ও অনলাইন সাইটে বিক্রি হচ্ছে ছোট আকারের গ্যাস কম্প্রেসর বা বুস্টার। বিক্রেতাদের ভাষ্য, লাইনে অল্প অল্প গ্যাস থাকলে এসব যন্ত্র ব্যবহার করে চুলায় গ্যাসের চাপ বাড়ানো যায়।
এ বিষয়ে আজ শনিবার মুঠোফোনে দারাজের হেড অব কমিউনিকেশন রাইসুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
গ্যাসলাইনে এ ধরনের বুস্টার বা কম্প্রেসর ব্যবহারের অনুমোদন নেই বলে জানিয়েছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি। প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক (ভিজিল্যান্স ডিভিশন) মো. শাহজাদা ফরাজী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, গ্যাসের সরবরাহব্যবস্থায় কোনো অননুমোদিত যন্ত্র ব্যবহার করা যায় না। কেউ কম্প্রেসর দিয়ে গ্যাস টেনে নিলে আশপাশের গ্রাহকের স্বাভাবিক সরবরাহ বিঘ্নিত হয়। এ ধরনের যন্ত্র ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কয়েক মাস ধরে গ্যাস–সংকট তীব্র হয়েছে। দিনের নির্দিষ্ট সময়ে অনেক বাসায় গ্যাসের চাপ কমে যাচ্ছে। কোথাও আবার দীর্ঘ সময় চুলা জ্বলছে না। এই পরিস্থিতিকেই কাজে লাগাচ্ছেন অনলাইন বিক্রেতারা। বিজ্ঞাপনে এসব যন্ত্রকে কখনো ‘গ্যাস প্রেশার বুস্টার’, কখনো ‘গ্যাস কম্প্রেসর’ আবার কখনো ‘গ্যাস পাম্প’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। বিজ্ঞাপনে মূল আকর্ষণ, কম চাপের গ্যাসে রান্নার সমস্যার সমাধান।
বিক্রেতারা ক্রেতাকে প্রথমেই জিজ্ঞেস করেন, বাসায় একেবারে গ্যাস থাকে না, নাকি অল্প অল্প আসে। কারণ, বিক্রেতাদের ভাষ্য, গ্যাস একেবারেই না থাকলে এসব যন্ত্র কাজ করবে না। তাই কেনার আগে পরিস্থিতি বুঝতে হবে।
অনলাইন বিজ্ঞাপন দেখে ক্রেতার পরিচয়ে কথা বললে বিক্রেতা হাবিবুর রহমান সানি মুক্তকণ্ঠকে তিনি বলেন, দিনে তাঁদের ১০০ থেকে ১৫০টি পণ্য বিক্রি হয়। মোহাম্মদপুর, মিরপুর, ধানমন্ডি, বনশ্রী, উত্তরা, বনানীসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় এসব পণ্য বেশি যায়। তাঁর ভাষ্য, বাসার লাইনে মাঝেমধ্যে গ্যাস এলে যন্ত্রটি কাজ করে। কিন্তু সারা দিন গ্যাস না থাকলে এটি কাজ করবে না।
হাবিবুর রহমান সানি বলেন, তাঁদের ব্যবসা দুই বছরের বেশি সময়ের। এসব কম্প্রেসর বিক্রি করছেন দেড় বছরের বেশি সময় ধরে। বর্তমানে গ্যাসের চাপ বাড়ানোর ছোট দুই মডেলের কম্প্রেসর বিক্রি করছেন। দুই মডেলেই এক বছরের গ্যারান্টি ও এক বছরের সার্ভিস ওয়ারেন্টি দিচ্ছেন তাঁরা। পণ্য নষ্ট হলে ক্রেতাকে নতুন পণ্য পাঠানো হয় ও পুরোনোটি কুরিয়ারে ফেরত নেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপনে এসব যন্ত্রকে কখনো ‘গ্যাস প্রেশার বুস্টার’, কখনো ‘গ্যাস কম্প্রেসর’ আবার কখনো ‘গ্যাস পাম্প’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। বিজ্ঞাপনে মূল আকর্ষণ, কম চাপের গ্যাসে রান্নার সমস্যার সমাধান।
ফেসবুকে এসব পণ্যের বিজ্ঞাপনে মূলত গ্যাসের কম চাপের সমস্যাকেই সামনে আনা হচ্ছে। কোথাও রান্নার সময়ের ভিডিও, কোথাও আগুনের তীব্রতা দেখিয়ে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। কম দামে দ্রুত সমাধানের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো সাইটে পণ্য বিক্রির পর ক্রেতাদের দেওয়া রিভিউ ও অভিজ্ঞতাও প্রচারে ব্যবহার করা হচ্ছে। নতুন ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ানোর কৌশল নেওয়া হচ্ছে। কম দামের পাশাপাশি গ্যারান্টি ও ওয়ারেন্টির বিষয়টিও বিজ্ঞাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মুক্তকণ্ঠ যে পাঁচজন বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলেছে, তাঁরা জানিয়েছেন, পুরোনো একটি মডেলও তাঁরা বিক্রি করেন। তবে সেটিতে শব্দ ও কম্পন বেশি হওয়ায় অভিযোগ আছে। তাই এখন নতুন মডেল আনা হয়েছে। বিক্রেতাদের দাবি, নতুন মডেলগুলোয় শব্দ ও কম্পন কমানোর দিকে কাজ করা হয়েছে। কম্প্রসারগুলো চীন থেকে আসে। তবে কীভাবে দেশে আসে, মূল আমদানিকারক কারা, এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তারা দেননি।
দিনে তাঁদের ১০০ থেকে ১৫০টি পণ্য বিক্রি হয়। মোহাম্মদপুর, মিরপুর, ধানমন্ডি, বনশ্রী, উত্তরা, বনানীসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় এসব পণ্য বেশি যায়। তাঁর ভাষ্য, বাসার লাইনে মাঝেমধ্যে গ্যাস এলে যন্ত্রটি কাজ করে। কিন্তু সারা দিন গ্যাস না থাকলে এটি কাজ করবে না।
অনলাইনে বিক্রি করলেও আইনি ঝুঁকি নিয়ে বিক্রেতাদের মধ্যে ভিন্ন ধরনের ধারণা রয়েছে। সব বিক্রেতা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত তাঁদের এ ধরনের কোনো আইনি ঝামেলায় পড়তে হয়নি। অনলাইনে এ নিয়ে কিছু পোস্ট দেখেছেন, তবে সরকারি পর্যায়ে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে তাঁদের জানা নেই।
তিতাস জানিয়েছে, কম্প্রেসর ব্যবহারের বিষয়টি নতুন নয়। শিল্পকারখানায় বড় আকারের কম্প্রেসর ব্যবহারের ঘটনা তারা দীর্ঘদিন ধরে পেয়ে আসছে। বিভিন্ন অভিযানে এসব যন্ত্র জব্দ করা হয়েছে। তিতাসের মহাব্যবস্থাপক (ভিজিল্যান্স ডিভিশন) মো. শাহজাদা ফরাজী বলেন, তিনি নিজেও ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালের দিকে শিল্পকারখানায় এ ধরনের কম্প্রেসর পাওয়ার কথা জানেন। তবে আবাসিক গ্রাহকদের কাছ থেকে ঠিক কতটি কম্প্রেসর জব্দ করা হয়েছে, তার নির্দিষ্ট সংখ্যা তিনি তাৎক্ষণিকভাবে দিতে পারেননি।
একজন অননুমোদিত যন্ত্র দিয়ে বেশি গ্যাস টেনে নিলে অন্য গ্রাহক স্বাভাবিক সরবরাহ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। এর বাইরে যন্ত্রটির মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বও তিতাসের হাতে থাকে না। ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়।
আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে কম্প্রেসর ব্যবহারের বিষয়টি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি নজরে আসার কথাও জানান তিনি। তিতাস এ বিষয়ে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করছে। তবে শুধু ব্যবহারকারী ধরে ব্যবস্থা নিলে সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হবে না মন্তব্য করে শাহজাদা ফরাজী বলেন, তাঁরা পেট্রোবাংলার মাধ্যমে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানিয়েছেন। এসব যন্ত্র যাতে দেশে আমদানি করা না যায়। তাঁর ভাষায়, বাজারে পণ্য থাকলে অভিযান চালিয়ে প্রত্যেক ব্যবহারকারীকে খুঁজে বের করা কঠিন। আমদানি বন্ধ করা গেলে মানুষ এসব যন্ত্র কিনতে পারবে না।
কম্প্রেসর ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে তিতাস বলছে, এতে গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়। একই লাইনে থাকা অন্য গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। একজন অননুমোদিত যন্ত্র দিয়ে বেশি গ্যাস টেনে নিলে অন্য গ্রাহক স্বাভাবিক সরবরাহ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। এর বাইরে যন্ত্রটির মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বও তিতাসের হাতে থাকে না। ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়।
যদিও বিক্রেতারা বলছেন, তাঁদের বিক্রি করা পণ্য নিয়ে এখন পর্যন্ত বড় কোনো দুর্ঘটনার খবর তাঁরা পাননি। তবে গ্যাসের লাইনে পানি থাকলে যন্ত্র নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার বাসার বিদ্যুতের লাইনে ভোল্টেজ ওঠানামা করলেও যন্ত্রের সমস্যা হতে পারে। এসব কারণে কিছু ক্রেতার অভিযোগ পাওয়া যায় বলেও জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
তিতাসের নিয়মিত অভিযানে কম্প্রেসর জব্দ করা হয়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের অননুমোদিত সরঞ্জাম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
গ্যাস ব্যবহারের নতুন নিয়মে বুস্টার ব্যবহারের বিষয়টি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বলেও জানিয়েছে তিতাস। সংস্থাটির ২০২৬ সালের গ্যাস বিপণন নিয়মাবলিতে অননুমোদিত সরঞ্জাম বা বুস্টার ব্যবহারের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিধান রাখা হয়েছে। আগে যেটিকে জরিমানা হিসেবে বলা হতো, নতুন নিয়মে সেটিকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে । এ ক্ষেত্রে কীভাবে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ ও আদায় করা হবে, তার প্রক্রিয়াও নিয়মে বলা হয়েছে।
শাহজাদা ফরাজী বলেন, তিতাসের নিয়মিত অভিযানে কম্প্রেসর জব্দ করা হয়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের অননুমোদিত সরঞ্জাম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।