করোনা মহামারির অভিঘাতে যখন গোটা দেশ স্থবির, তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন মানিকগঞ্জের তরুণ ইয়াসিনুর রহমান। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা শেষ করা এই তরুণ নিজের উদ্যোগে গড়ে তোলেন সামাজিক সংগঠন ‘জনস্বার্থে আমরা’। শিক্ষকতার পাশাপাশি সমাজের অবহেলিত, সুবিধাবঞ্চিত ও অসহায় মানুষের কল্যাণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
ইয়াসিনুর রহমানের বাড়ি মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার বড় সুরুন্ডি গ্রামে। ২০০৮ সালে মানিকগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং পরে বেগম জরিনা ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ২০১০-২০১১ শিক্ষাবর্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগে ভর্তি হয়ে ২০১৪ সালে বিবিএ সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি রহিমানগর ডিগ্রি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত।
মুক্তকণ্ঠের সাথে আলাপকালে ইয়াসিনুর রহমান বলেন, “ছোটবেলা থেকেই সামাজিক কাজের প্রতি আলাদা টান ছিল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করার পর দীর্ঘ দিন বেকারত্বের বোঝা নিয়ে চলতে হয়েছে। তবে মানুষের কল্যাণে কাজ করা থামাইনি। ২০২০ সালে করোনাকালে মানুষের কর্মহীনতা ও ঘরবন্দি জীবনের নানাবিধ সংকট দেখে বড় পরিসরে কাজ শুরু করি। সেই ভাবনা থেকেই ধীরে ধীরে ‘জনস্বার্থে আমরা’ সামাজিক সংগঠনটি আত্মপ্রকাশ করে।”
ইয়াসিন জানান, দেশের যেকোনো সংকটে সংগঠনটি সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের পাশে দাঁড়ায়। শিক্ষা, চিকিৎসা, বয়স্ক ভাতা, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা উপকরণ ও আর্থিক সহায়তা, বৃক্ষরোপণ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিসহ বহুমুখী কল্যাণমূলক কাজ করে যাচ্ছে সংগঠনটি।
শুরুর চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে ইয়াসিন বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা শেষ করে বেকার অবস্থায় যখন কাজ শুরু করি, তখন সমাজের অনেকেই বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখেনি। চাকরি না খুঁজে কেন অসহায় মানুষের পেছনে সময় দিচ্ছি—তা নিয়ে নানা কথা শুনতে হয়েছে। তবে সব সমালোচনা উপেক্ষা করে এলাকার কয়েকজন সহপাঠীকে সাথে নিয়ে কাজ চালিয়ে গেছি। আজ সেই মানুষগুলোই আমাদের কাজের প্রশংসা করেন এবং উৎসাহ দেন।”
নিজের জীবনদর্শনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমাদের মৃত্যু সুনিশ্চিত। তাই মানুষের কল্যাণে কাজ করাই সবচেয়ে সঠিক পথ। সুযোগ থাকলে প্রত্যেকেরই উচিত সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। একজন শিক্ষার্থী যেমন বই পড়ে পরীক্ষায় সফল হয়, তেমনই পড়ালেখার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতাও পালন করা উচিত।”
ইয়াসিনুর রহমান বলেন, “‘জনস্বার্থে আমরা’ সংগঠনের কার্যক্রম মূলত সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের আর্থিক সহযোগিতায় পরিচালিত হয়। আমি নিজেও শিক্ষকতা পেশা থেকে অর্জিত অর্থের একটি অংশ ব্যয় করি। পাশাপাশি সংগঠনের সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনুদানও কাজে লাগানো হয়। মানুষের কল্যাণে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করে যাওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য।”
সংগঠন সূত্রে জানা যায়, ‘জনস্বার্থে আমরা’ এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ থেকে ৪০ জন অসহায় শিশুর লেখাপড়ার খরচ বহন করেছে। এছাড়া মানিকগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় দেড় থেকে দুই হাজারের বেশি গাছের চারা রোপণ এবং বেশ কয়েকজন যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়েছে।
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর হোসেন বলেন, “মানুষের জন্য ভালো কাজ করতে জনপ্রতিনিধি বা বিত্তশালী হওয়ার প্রয়োজন নেই, কেবল সদিচ্ছা ও ভালো মানসিকতাই যথেষ্ট। ইয়াসিন ভাইকে দেখেই আমরা এই কাজে যুক্ত হয়েছি। নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী চাঁদা তুলে আমরা সংগঠন পরিচালনা করি, আবার অনেক সময় সমাজের স্বহৃদয় ব্যক্তিরাও এগিয়ে আসেন।”
তিনি আরও যোগ করেন, “গত ২০২৪ সালের আগস্টে কুমিল্লায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিলে আমাদের টিম সেখানে গিয়ে খাদ্য সহায়তা প্রদান করে। বন্যায় মানুষের হাহাকার ও কষ্ট আমরা খুব কাছ থেকে দেখেছি। ‘জনস্বার্থে আমরা’ কেবল একটি সংগঠন নয়, এটি তরুণদের সামাজিক কাজে অনুপ্রাণিত করার একটি বড় প্ল্যাটফর্ম।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ইয়াসিন এখন এলাকার তরুণসহ সবার কাছে এক প্রিয় নাম। তার সংগঠনের মাধ্যমে বহু অসহায় মানুষ উপকৃত হয়েছেন। তাদের ভাষ্য, সমাজে তার মতো তরুণদের সংখ্যা বাড়লে একটি সুন্দর সমাজ গঠন সম্ভব।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মানিকগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বাস বলেন, “আমাদের সমাজে ইয়াসিনের মতো তরুণরা সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই ঝরে পড়া ও অসহায় শিশুদের নিয়ে কাজ করছেন। এতে সাধারণ মানুষ যেমন উপকৃত হচ্ছে, তেমনই তরুণ সমাজও ইতিবাচক কাজে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। সমাজের বিত্তশালীরা যদি এসব তরুণদের পাশে দাঁড়ায়, তবে বহু সমস্যার সমাধান সম্ভব এবং একটি আদর্শ সমাজ গড়ে তোলা সহজ হবে।”