ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইলেকট্রিশিয়ান মাঈনুল ইসলামের বিরুদ্ধে চোরাই যন্ত্রপাতি কিনে হাসপাতালের সরঞ্জাম মেরামতে ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে হাসপাতালের নষ্ট যন্ত্রাংশ বিধিবহির্ভূতভাবে বাইরে বিক্রি করার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি সমির শেখ (৪০) নামে এক ব্যক্তিকে আটকের পর এই অনিয়মের বিষয়টি সামনে আসে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী আবিদুল হাসানের দাবি, আটক সমির শেখ স্বীকার করেছেন যে তিনি চুরি করা মালামাল হাসপাতালের ইলেকট্রিশিয়ান মাঈনুল ইসলামের কাছে বিক্রি করেছিলেন। পরবর্তীতে সমির শেখকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালে গেলে মাঈনুল ইসলামের কাছ থেকে দুটি হ্যামার ড্রিল ও একটি লেজার মেশিন উদ্ধার করা হয় বলে জানান ওই ব্যবসায়ী।
আবিদুল হাসান জানান, ফরিদপুর শহরের বদরপুর মারকাজ মসজিদের পাশে তার ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনের কাজ চলছিল। সেখান থেকে বিভিন্ন সময়ে বেশ কিছু যন্ত্রপাতি চুরি হয়। তার দাবি, চুরি হওয়া মালামালের মধ্যে ৪৩ হাজার টাকা মূল্যের একটি লেজার মেশিন, ৩৩ হাজার টাকা মূল্যের দুটি হ্যামার ড্রিল, একটি সার্কুলার, ২১০০ ওয়াটের একটি রাউটার, দুটি ছোট ড্রিল ও একটি বড় ড্রিলসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ছিল। সব মিলিয়ে এসব মালামালের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার টাকা।
তিনি আরও জানান, সিসিটিভি ফুটেজের মাধ্যমে চোরকে শনাক্ত করে আটক করা হয়। এরপর ওই ব্যক্তি স্বীকার করেন যে তিনি চুরি করা মালামাল ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইলেকট্রিশিয়ান মাঈনুল ইসলামের কাছে বিক্রি করেছেন। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাত ৯টার দিকে তাকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালে গেলে মাঈনুল ইসলামের কাছে একটি লেজার মেশিন ও দুটি হ্যামার ড্রিল পাওয়া যায় বলে দাবি করেন ব্যবসায়ী।
আবিদুল হাসানের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক সমির শেখ নগরকান্দা উপজেলার বিলনালিয়া গ্রামের খলিল শেখের ছেলে এবং তিনি একটি ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি কাজের সুযোগে মালামাল চুরি করে একটি হার্ডওয়্যার দোকানে নিয়ে যেতেন এবং ওই দোকানদারের মাধ্যমেই মাঈনুল ইসলামের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। এরপর থেকে তিনি অল্প দামে চোরাই মালামাল মাঈনুলের কাছে বিক্রি করে আসছিলেন।
ব্যবসায়ী আরও অভিযোগ করেন, চোরকে ধরে হাসপাতালের একটি কক্ষে রাখা হলে হাসপাতালের কিছু কর্মী তাকে পালানোর সুযোগ করে দিয়ে সহযোগিতা করেন। পরদিন বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে হাসপাতালের পুরাতন ভবনের ১ নম্বর কক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষের সঙ্গে একটি রফা বা মীমাংসা করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সেখানে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৪৫ হাজার টাকা এবং দুটি যন্ত্র ফেরত দেওয়া হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ না করার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির কাছ থেকে একটি অঙ্গীকারনামা লিখে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আবিদুল হাসান বলেন, ‘আমাদের মালামাল পেয়েছি, সমাধান হয়ে গেছে।’ তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে না জানিয়ে হাসপাতালের ভেতরে কীভাবে এই আপস করা হলো এবং অঙ্গীকারনামার শর্ত কী ছিল, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি।
হাসপাতালে কর্মরত এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মাঈনুল ইসলাম নিয়মিত চোর চক্রের কাছ থেকে সস্তায় মালামাল কেনেন এবং পরে সেগুলো নতুন কেনা দেখিয়ে ভাউচারের মাধ্যমে হাসপাতালের মেরামতের কাজে ব্যবহার করেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, হাসপাতালের নষ্ট যন্ত্রাংশ একটি চক্রের মাধ্যমে বাইরে বিক্রি করা হয়। এছাড়া জেনারেটরের জ্বালানি তেল কেনাতেও ভয়াবহ অনিয়ম হচ্ছে। ওই ব্যক্তির দাবি, হাসপাতালের কনফারেন্স রুমের একটি এলইডি টেলিভিশন, এসি ও ফ্যানসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম মাঈনুল ইসলাম নিজের বাসায় ব্যবহার করছেন।
সব অভিযোগ অস্বীকার করে মাঈনুল ইসলাম বলেন, “ভাই, আমি ঝামেলার মধ্যে আছি। এসব নিয়ে কথা বলতে পারব না।”
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সরাসরি কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তার সহকারী সামিমের মাধ্যমে তিনি জানান, বর্তমানে ব্যস্ত আছেন এবং আগামী রোববার এ বিষয়ে কথা বলবেন।