বগুড়া শহরের মালগ্রাম মধ্যপাড়া দীঘিপাড় এলাকায় উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের রহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, নিহত ব্যক্তির নাম ওয়াহেদ হোসেন ওরফে নিঝুম। তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছেন তার দুই বন্ধু নাজিম উদ্দিন ও মো. স্বপন। হত্যার আগে নিঝুমকে অচেতন করার জন্য তারা অনলাইন থেকে চেতনানাশক ওষুধের নাম খুঁজে বের করেছিলেন।

গত বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) নিঝুমের ভাই সোহেল হোসেন বগুড়া সদর থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামির বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার প্রেক্ষিতে পুলিশ কাহালু উপজেলার মদনাই গ্রাম থেকে নাজিমকে গ্রেপ্তার করে। তাকে আদালতে হাজির করলে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. আরিফুল ইসলাম পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

তদন্তকারী পুলিশ জানায়, গত ১২ আগস্ট একটি ধানখেত থেকে বস্তাবন্দী অবস্থায় নিঝুমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিঝুম বগুড়া মহানগরের সুত্রাপুর এলাকার একজন ফল ব্যবসায়ী ছিলেন। ধার দেওয়া টাকা ফেরত চাওয়া নিয়ে বিরোধের জেরে তাকে হত্যা করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত নাজিম প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন। পুলিশ এখন তার সহযোগী স্বপনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বগুড়া সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শরিফুল ইসলাম বলেন, "নাজিমকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। স্বপনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।"

এজাহার অনুযায়ী, নিঝুম স্টেশন সড়কে তার বাবার সঙ্গে ফলের আড়ত চালাতেন। নাজিম ও স্বপন একটি বেসরকারি সংস্থায় বাবুর্চি হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং নিঝুমের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্ব ছিল। কিছুদিন আগে নিঝুম তার মায়ের নামে ওই সংস্থা থেকে সাত লাখ টাকা ঋণ নেন। সেই টাকা থেকে স্বপনকে দুই লাখ এবং নাজিমকে এক লাখ টাকা ধার দেন। পরবর্তীতে এই টাকা ফেরত চাওয়া নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়।

পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে নাজিম জানান, এই বিরোধের জেরেই তিনি ও স্বপন নিঝুমকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ৭ আগস্ট নিঝুমকে মালগ্রাম এলাকার ওই বেসরকারি সংস্থার কার্যালয়ে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে নাজিম তার ফোনে অনলাইনে অচেতন করার ওষুধের নাম খোঁজেন। এরপর কোমল পানীয়র সঙ্গে চেতনানাশক ও বিষাক্ত দ্রব্য মিশিয়ে নিঝুমকে পান করানো হয়। নিঝুম মারা যাওয়ার পর রাতে তার লাশ বস্তায় ভরে কার্যালয়ের নিকটবর্তী একটি ধানখেতে ফেলে রাখা হয়। পরদিন ৮ আগস্ট নাজিম ও স্বপন স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান।

বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহীম আলী জানান, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নাজিম ও স্বপনকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়। নাজিমকে গ্রেপ্তারের পর হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।

নিঝুম নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিল। নিখোঁজের পাঁচ দিন পর ১২ আগস্ট ধানখেত থেকে বস্তাবন্দী অর্ধগলিত মরদেহটি উদ্ধার করে পুলিশ। শুরুতে পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় মরদেহটি বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়, তবে পরে স্বজনরা নিঝুমের পরিচয় শনাক্ত করেন। পুলিশ নিঝুমের ফোনের কল লিস্ট ও তথ্য বিশ্লেষণ করে নাজিম ও স্বপনের সঙ্গে তার যোগাযোগের প্রমাণ পায় এবং তদন্ত এগিয়ে নেয়।

বগুড়ার পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ বলেন, "নাজিম প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার আগে অনলাইনে অচেতন করার ওষুধের নাম খোঁজার কথা জানিয়েছেন তারা। হত্যায় ব্যবহৃত দ্রব্য, হত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ এবং স্বপনের ভূমিকা সম্পর্কে আরও তথ্য জানতে তদন্ত চলছে।"