ঠাকুরগাঁওয়ে অনলাইন জুয়ার নেশায় রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার আশায় অহরহ প্রাণ হারিয়েছেন সাধারণ মানুষ। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন বেটিং অ্যাপ ও ক্যাসিনোয় লোভে পড়ে শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ জড়িয়ে পড়ছেন। সাইবার সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি স্মার্টফোন ও কয়েকটি ক্লিকেই রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার ভুল ধারণা তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হয়। শুরুতে সামান্য লাভ দেখিয়ে বিশ্বাস অর্জন করা হলেও পরবর্তীতে বড় অঙ্কের টাকা হারিয়ে ঋণের পাহাড়, সংসারে অশান্তি এবং মানসিক অবসাদ দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি আত্মহত্যার কারণ হিসেবে কাজ করছে।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ‘আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস’ উপলক্ষে মুক্তকণ্ঠ ঠাকুরগাঁওয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেওয়া কয়েকজনের পরিবার ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার তথ্য সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করেছে। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার হরিহরপুর নয়াপাড়ার ব্যবসায়ী মনির হোসেন চলতি বছরের এপ্রিলে ‘বেট জিলি’ নামক সাইটে বিপুল অর্থ হারিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। এর আগে পৌর শহরের পূর্ব হাজীপাড়ার সাদেকুল ইসলাম বসতবাড়ি বিক্রি করে পাওয়া সব টাকা অনলাইন জুয়ায় হারিয়ে আত্মহত্যা করেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার মহিশমারী গ্রামের আকরাম আলী নিঃস্ব হয়ে মারা যান। আর ২০২৪ সালের মে মাসে একই উপজেলার রাজিউর রহমান রাজু মাত্র ছয় মাসে ২০ লাখ টাকার বেশি হারিয়ে আত্মহত্যা করেন।

এক প্রতিবেশী আব্দুর জব্বার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "অনলাইন জুয়ায় শুরুতে কয়েকবার জিতিয়ে লোভ দেখানো হয়। যখন বেশি করে টাকা জুয়াতে দেওয়া হয় তখন থেকে হারানো শুরু হয়। অনেকে অনলাইন জুয়ার কারণে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। অনেকের সংসারে অশান্তি দেখা দেয়। কেউ জমি বিক্রি করে বা সব কিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন।"

সাইবার সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ফেসবুক, টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারের গোপন গ্রুপের মাধ্যমে স্থানীয় এজেন্টরা জুয়াড়ি সংগ্রহ করেন। শুরুতে অল্প টাকায় খেলিয়ে কয়েকবার জিতিয়ে বিশ্বাস তৈরি করা হয়। এরপর আরও বড় অঙ্কের অর্থ ঢালার জন্য প্রলুব্ধ করা হয়। হারানো টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় জুয়াড়িরা ধার-দেনা, ঋণ করেন–এমনকি জমি-সম্পত্তি বিক্রি করেও জুয়ার নেশায় পড়ে থাকেন। এক সময় সব হারিয়ে ঋণ, পারিবারিক কলহ, মানসিক অবসাদ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়েন তারা।

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, সারা দেশে অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা থেকে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হচ্ছে। বিকাশ, নগদ, রকেট, বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব এবং বিদেশভিত্তিক পেমেন্ট চ্যানেলের মাধ্যমে এই অর্থ হাতবদল হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় এজেন্টরা খেলোয়াড়দের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে মূল নেটওয়ার্কে পাঠিয়ে দেন। বিদেশি সার্ভারে পরিচালিত হওয়ায় এসব অ্যাপের মূল হোতাদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) ঠাকুরগাঁও জেলার সভাপতি আব্দুল লতিফ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "১/২ বছর ধরে অনলাইন জুয়ার প্রবনতা ঠাকুরগাঁও জেলায় বাড়ছে। কিছু দিন আগে একজনের আত্মহত্যার খবর পেয়েছি। প্রশাসনের পক্ষে একাই এই অনলাইন জুয়া দমন করা সম্ভব না। অভিভাবকদের নিজের সন্তানের প্রতি খেয়াল রাখা উচিত এবং খারাপ দিকটা তাদের বোঝানো উচিত। তাহলে হয়তো প্রবনতা কমে আসবে।"

জেলা পুলিশের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরে ঠাকুরগাঁওয়ে সাইবার সুরক্ষা আইনে চারটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া জুয়া প্রতিরোধ আইনের সাতটি মামলায় ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঠাকুরগাঁও সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহাজান খান বলেন, "অনলাইন জুয়া ঠাকুরগাঁও জেলায় অনেক বেড়ে গেছে। ইতোমধ্যে আমরা অভিযান পরিচালনা করে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছি। আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে অনলাইন জুয়ার কুফল সম্পর্কে সচেতন করছি।"

তিন বছর আগে ২০২৩ সালে বিয়ে করে সংসার জীবন শুরু করেছিলেন নাহিদ ইসলাম। তার ঘরে আসে একটি ছেলে সন্তান। বাবা-মা ও স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে ভালোই তার চলছিল সংসার। কিন্তু হঠাৎ করে তিনি বদলে যেতে থাকেন। স্বজন, প্রতিবেশী–সবাই তার পরিবর্তন লক্ষ্য করলেও কারণ বুঝে উঠতে পারছিলেন না। পরে জানা যায়, অনলাইনে জুয়ায় রাতারাতি কোটি হওয়ার নেশা তাকে প্রলুব্ধ করেছে। প্রথমদিকে কয়েকবার টাকা জেতায় তিনি আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগ করতে শুরু করেন। কিন্তু ভাগ্য বদলের সেই নেশা খুব অল্প সময়ে দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। একের পর এক টাকা খুইয়ে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন তিনি। পরিবারের সদস্যদের কাছেও নিজের কষ্ট প্রকাশ করতেন না। অবশেষে হতাশা ও আর্থিক সংকটের কাছে হার মেনে দুই মাস আগে বিষপান করে আত্মহত্যা করেন। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের সব স্বপ্ন মুহূর্তে ধুলোয় মিশে যায়।

নাহিদের মৃত্যুর পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই ছেলের কবরের পাশে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তার মা নাজি বেগম। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "আমার ছেলেকে অনলাইন জুয়া মেরে ফেলেছে। টাকা হারিয়ে সে মানসিকভাবে একেবারে ভেঙ্গে পড়েছিল। আমরা বুঝতেই পারিনি সে এত বড় বিপদে ছিল।" নাজি বেগম বলেন, "সরকারের কাছে আমার একটাই অনুরোধ–এই অনলাইন জুয়া বন্ধ করে দেওয়া হোক। আমার ছেলের মতো কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়। এখনও অনেক ছেলে এই অনলাইন জুয়া খেলছে।"

নাহিদের স্বজন খুশি মনি বলেন, "নাহিদের এক বছরের একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। স্বামী-স্ত্রী খুব সুখেই সংসার করছিল। কিন্তু অনলাইন জুয়া সেই সুখের সংসার শেষ করে দিয়েছে। এখন শিশু সন্তানকে নিয়ে তার স্ত্রী বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। একটা পরিবারের সব স্বপ্ন মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেছে।"

প্রতিবেশী রুমি আক্তার বলেন, "খুব শান্ত-ভদ্র ছেলে ছিল। কিন্তু অনলাইন জুয়ার নেশায় পড়ে একেবারে বদলে যায়। আজ নাহিদ গেছে, কাল হয়তো আমাদের পরিবারের কেউ এমন ফাঁদে পড়বে। তাই সরকারের অনুরোধ–অনলাইন জুয়া বন্ধ করুন। আর যেন কোনো মা সন্তান না হারান, কোনো স্ত্রী স্বামীহারা না হন।"

অভিভাবকরা বলছেন, আগে মাদক নিয়ে পরিবারগুলো যতটা উদ্বিগ্ন ছিল, এখন তার চেয়ে ভয়াবহ হয়ে উঠেছে অনলাইন জুয়া। এই নেশা ঘরের ভেতরে ফোন এর মাধ্যমে চলছে। পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় বুঝতে পারেন না, কখন তাদের সন্তান বা স্বজন ভয়ংকর এই ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছেন। জেলা শহরের এক অভিভাবক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, "সন্তান ঘরে বসে ফোন চালাচ্ছে। কিন্তু সে পড়াশোনা করছে, নাকি অনলাইন জুয়া খেলছে, সেটা বোঝা খুব কঠিন। অধিকাংশ পরিবার এখন আতঙ্কের মধ্যে আছে।"

ওয়াহিদ হোসেন বলেন, "আজ অন্যের সন্তান মারা যাচ্ছে, কাল হয়তো আমার সন্তানও একই পথে যাবে। সরকার যদি এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে পুরো যুবসমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে। শুধু তরুণ নয়, এখন সব বয়সের মানুষ এই নেশায় জড়িয়ে পড়ছেন।"

আরেক অভিভাবক মো. সোহাগ আলী বলেন, "অনলাইন জুয়া একজন মানুষকে নয়, একটি পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। এই ভয়াবহ ব্যাধির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশি সরকারের কঠোর অভিযান প্রয়োজন।"

সার্বিক বিষয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. খোদাদাদ হোসেন বলেন, "অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পুলিশি অভিযান দিয়ে এটি পুরোপুরি প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। পরিবারকে সন্তানদের ফোন ব্যবহারের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকে একযোগে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করতে হবে। সবাই একসঙ্গে এগিয়ে এলে অনলাইন জুয়া অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।"