যশোর সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের আলোচিত ‘হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট’-এর কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের নির্দেশে গত মঙ্গলবার থেকে এই হোটেল ও রিসোর্টের সব বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত মোট ৭০ জন কর্মী তাঁদের চাকরি হারিয়েছেন।
২০১৭ সালের ১০ ডিসেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় ৩০৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই আইটি পার্কটি উদ্বোধন করেন। পার্কের মূল উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের বিকাশ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। সরকার পার্কটি পরিচালনার দায়িত্ব দেয় টেকসিটি বাংলাদেশ লিমিটেড নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে।
পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়িক লোকসান ঠেকানোর অজুহাতে ২০২৩ সালের ২৬ জানুয়ারি টেকসিটি তাদের ডরমিটরি ভবনটি ১০ বছরের জন্য সাব-লিজ দেয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান খান প্রপার্টিজ গ্রুপকে। এর পরই সেখানে ‘যশোর আইটি পার্ক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট’ নামে তিন তারকামানের বাণিজ্যিক হোটেল যাত্রা শুরু করে।
নতুন করে বরাদ্দ দেওয়ার উদ্দেশ্যে হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ এই সাব–লিজ বাতিল ও কার্যক্রম বন্ধের পদক্ষেপ নেয়। আইটি পার্কের বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ‘খান প্রোপার্টিজের চুক্তিটি মূলত সম্পন্ন হয়েছিল টেকসিটি বাংলাদেশ লিমিটেডের সঙ্গে। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে টেকসিটি লিমিটেডের চুক্তিটি বাতিল করা হয়। ফলে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খান প্রোপার্টিজের চুক্তিটিও স্বাভাবিকভাবেই অকার্যকর হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুরোধে খান প্রোপার্টিজ সাময়িকভাবে তাদের কাজ চালিয়ে আসছিল। তবে সেই বর্ধিত সময়সীমা শেষ হওয়ায় সম্প্রতি হোটেল ও রিসোর্টটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বর্তমানে রিসোর্টটি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান এবং এখানে নিয়মিত দেশি-বিদেশি অতিথিদের যাতায়াত রয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, কর্তৃপক্ষ এখন অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে এর পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
খান প্রপার্টিজের জনসংযোগ কর্মকর্তা শামসুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই যথাযথ নিয়ম মেনে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করে আসছিলাম। এখানে আমাদের বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে। বর্তমানে আমরা এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমি নিজে এবং আরও অনেক কর্মী আজ কর্মহীন হয়ে পড়েছি। এই আকস্মিক বেকারত্ব আমাদের সবার মানসিক অবস্থাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। আমাদের দাবি, যদি এখানে হোটেল ও রিসোর্টটি পুনরায় চালু করা হয়, তবে খান প্রপার্টিজের মতো অভিজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। আমরা আশা করি, কর্মীদের জীবন ও জীবিকার কথা বিবেচনা করে হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ তাদের সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করবে।’
হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের যশোরের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী পরিচালক নজরুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আসলে এ ব্যাপারে আমরা কিছু বলতে পারছি না। এটা ঢাকা অফিস বলতে পারবে।’
বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মামুনুর রশীদ ভূঞা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘যশোর সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের ২০১৭ সালে নিয়োগ করা পার্ক ব্যাবস্থাপনা কোম্পানি (পিএমসি) প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ২০২৫ সালের ১ জুন থেকে চুক্তি বাতিলের পর সরাসরি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ডরমিটরি ভবন পরিচালিত হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে আগের লোকবল দিয়ে কর্তৃপক্ষ দিয়ে এটি পরিচালিত হয়ে আসছিল। এর মধ্যে একটি নতুন পরিচালনা প্রতিষ্ঠান নিয়োগের লক্ষ্যে তিনবার টেন্ডার আহ্বান করা হয়। বর্তমানে মূল্যায়ন কার্যক্রম শেষে চুক্তি সম্পাদন করা হচ্ছে। নতুন যেকোনো একটি প্রতিষ্ঠান নিয়োগপ্রাপ্ত হবে। মূল্যায়ন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য এ পর্যায়ে কয়েক দিনের জন্য এটি বন্ধ রাখা হয়েছে। আর কয়েক দিনের মধ্যে আশা করা যায় মূল্যায়নপূর্বক নতুন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নিয়োগ পাবে।’
খান প্রপার্টিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদুর রহমান খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘একটা অলাভজনক পরিত্যক্ত জায়গাকে নিয়ে চার বছর ধরে একটু একটু করে সফল করেছি। প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে ভবনটিকে সংস্কার করেছি। লক্ষ্য ছিল কেবল ব্যবসায়িক মুনাফা নয়; বরং যশোরের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে পর্যটকদের সামনে তুলে ধরা। যশোরের মতো জায়গায় আন্তর্জাতিক মানের সেবা দিচ্ছি। এখানে যশোরের মানুষের কর্মস্থান করেছি। ১০০ জনের কাজের সুযোগ হয়েছে। আরও ১০০ জনের কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিয়েছি। ঠিক তখনই আমাদের কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে। আমরা সরকারের সব সিদ্ধান্ত মেনেই আমাদের কাজ চালাচ্ছিলাম। এমন সিদ্ধান্ত আমাকে বিব্রত করেছে। ২৫ বছর ধরে এই খাত নিয়ে কাজ করছি। কখনো এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি। আমরা এখানে ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু কোনো চুক্তি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা করা সম্ভব না। কর্তৃপক্ষকে বারবার বলা সত্ত্বেও তারা চুক্তি করেনি। তবে আমাদের এখনো সরকারের ওপর আস্থা আছে। আমাদের যে সফলতা, এটির ওপর সরকার গুরুত্ব দিয়ে আমাদের সঙ্গে চুক্তি করে আবার কাজের সুযোগ করে দেবে। আমাদের কর্মীদের আমরাও আবার কাজের সুযোগ করে দিতে চাই। পাশাপাশি আগেও বলেছি, এখনো বলছি—আমরা আরও ১০০ জনের কর্মসংস্থান এখন করব। আর সেটি সম্ভব।’
তবে প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি বৃস্পতিবার রাতে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘ওটা তো বন্ধ হয়নি। আমরা এক্সিস্টিং যে টেক সিটি নামে সাপ্লায়ার আছে, ওই সাপ্লায়ারকে রিপ্লেস করার উদ্যোগ নিয়েছি। কারণ, তাদের ২৬ লাখ টাকা ইউটিলিটি বিলসহ প্রায় ৪০ লাখ টাকা বকেয়া আছে। এর বাইরে তারা প্রায় পাঁচ কোটি টাকার কাছাকাছি মেনটেন্যান্স করে না। এ অবস্থায় রেখে গেছে। অর্থাৎ কথা ছিল যে বিল্ডিং ভবনগুলোর রুমগুলো তারা মেনটেন্যান্স করবে। মেনটেইন না করতে করতে বিল্ডিংটার একেবারে জরাজীর্ণ দশা। তো তারা বিশাল ক্ষতি করেছে ওই জায়গার, প্লাস যেহেতু সাবেক সরকারের তাদের সাথে আমাদের যে ইনভেস্টমেন্ট কমিউনিটি, ওখানে যে যশোর হাইটেক পার্কে বিজনেস এন্টারপ্রেনিউর আছে তারা কমফর্টেবল নয়। সবকিছু মিলে এটার সাপ্লায়ার আমরা চেঞ্জ করব আর কি।’






