বিভিন্ন ইসলামি আন্দোলনের নৃবৈজ্ঞানিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করা আমার বিদ্যায়তনিক গবেষণার অন্যতম বিষয়। গবেষণার এক পর্যায়ে একজন তথ্যদাতা আমাকে জানিয়েছিলেন, কীভাবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক ‘উগ্রবাদী’ বড় ভাইয়ের প্রভাবে পড়েছিলেন। ইসলামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের বই পড়ার প্রলোভন দেখিয়ে তাকে ধীরে ধীরে সংগঠনের ভেতরে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে তিনি সময়মতো বিষয়টি বুঝতে পেরে সেই ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। সবার ক্ষেত্রে এমনটা ঘটে না।

ঘটনাটি যখন ঘটে, তখন ওই ব্যক্তি স্কুলের শেষ দিকে ছিলেন। তাঁর বাবা বিষয়টি আঁচ করতে পেরে ওই বড় ভাইকে ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করতে বলে দেন। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল ডিভাইসের সহজলভ্যতার কারণে এ ধরনের প্রলোভন আরও সূক্ষ্মভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

তাই উগ্রবাদ নিয়ন্ত্রণের উপায় খুঁজতে হলে এর সামাজিক প্রেক্ষাপট বোঝা প্রয়োজন। উগ্রবাদের চর্চা ও প্রকাশ জনপরিসরের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হতে পারে, যদিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটি ব্যক্তির আচরণগত পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে এর সূক্ষ্ম উপস্থিতি শনাক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।

উগ্রবাদের সংজ্ঞা ও এর বিস্তারের ধরন নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। সংজ্ঞাগত জটিলতা এবং প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের কারণে এই আলোচনা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে উগ্রবাদকে প্রধানত সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার প্রবণতা এই ধারণাকে আরও সমস্যাসংকুল করে তোলে। প্রচলিত সংজ্ঞায় একে অস্পষ্টভাবে মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তবে কেবল মতাদর্শই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পূর্বশর্ত নয়; বরং যারা ধর্মের মাধ্যমে উগ্রবাদী চিন্তার যৌক্তিকতা খোঁজেন, তাদের জন্য ধর্ম ব্যবহার করা উগ্রবাদের একটি রাজনৈতিক প্রকাশভঙ্গি মাত্র।

উগ্র চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়ে একজন ব্যক্তি জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনতে পারেন, তবে তা যে অবশ্যই তাকে সন্ত্রাসবাদের দিকে নিয়ে যাবে—এমনটি নয়। মানুষের মনোজগতে উগ্রপন্থার প্রভাব থাকলেই যে তিনি তা বাস্তবে রূপ দেবেন, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বোমা বা বোমাসদৃশ বস্তুর উপস্থিতির খবর পাওয়া গেছে। সাভারের একটি বাসায় কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের তত্ত্বাবধানে বোমাসহ গ্রেপ্তারের ঘটনা জনমনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এমনকি এ বিষয়ে জাতিসংঘের উদ্বেগ আমাদের জন্য আশঙ্কার বিষয়। তবে কেউ কেউ মনোজগতে বিকশিত উগ্রবাদী চিন্তার বাস্তবায়ন করতে চাইবেন না—এমনটা ভেবে বসে থাকার সুযোগ নেই। সামাজিক পরিসরে উগ্রবাদী চিন্তা ও আচরণের দৈনন্দিন প্রকাশকে হালকাভাবে দেখার অবকাশ নেই, কারণ উগ্রবাদ একটি জটিল সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রপঞ্চ।

বাংলাদেশে বিগত কয়েক দশকে ধারাবাহিক বোমা হামলা এবং ঢাকার অভিজাত এলাকার হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। দেখা গেছে, উগ্রপন্থায় জড়ানো অনেক তরুণ উচ্চ সামাজিক-অর্থনৈতিক শ্রেণি থেকে এসেছেন এবং কেউ কেউ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। এটি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক উগ্রবাদের প্রচলিত একপেশে ধারণার চেয়ে ভিন্নতর অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।

বিশেষ করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে এই ধরনের উগ্রবাদী ধারণার ব্যাপক বিকাশ ঘটে। অনেকে একে তৎকালীন কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিরোধ বা রেজিস্ট্যান্স হিসেবে দেখেন। সেই সময়ে রাষ্ট্রীয় পরিসরে উগ্রবাদ নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা বৈশ্বিক ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। তবে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আমরা আবারও সমাজের নানা স্তরে উগ্রপন্থী চিন্তার প্রকাশ দেখতে পাচ্ছি, যা মূলত দুই ধরনের।

প্রথমত, জনপরিসরে উগ্রবাদী চিন্তা ও আচরণের দৈনন্দিন প্রকাশ ঘটছে। ধর্মের পিতৃতান্ত্রিক ও বিরূপ ব্যাখ্যার মাধ্যমে নারীর প্রতি অবমাননা ও তার যৌক্তিকতা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি ভিন্নচিন্তা ও দর্শনের মানুষের ওপর হামলা ও সহিংসতা বাড়ছে। বাউল, মাজার ও মাজারপন্থীদের পাশাপাশি মুক্তকণ্ঠ, ডেইলি স্টার এবং ছায়ানটের মতো প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা হয়েছে। সাংস্কৃতিক চর্চাকে ইসলামবিরোধী বলে প্রচার করে ঘৃণার বয়ান তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে, যার পেছনে গভীর উগ্রবাদী চিন্তা কাজ করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উগ্রবাদী চিন্তা ও আচরণকে উৎসাহিত করে এমন বই প্রকাশের হিড়িক। শঙ্কার বিষয় হলো, আল-কায়েদা ও আইএসের মতো নিষিদ্ধ সংগঠনের সাথে জড়িত লেখকদের বইও এই তালিকায় রয়েছে, যা তরুণদের মনে সন্ত্রাসবাদী চিন্তার বীজ বপন করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বোমা বা বোমাসদৃশ বস্তুর উপস্থিতি এবং সাভারে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের মাধ্যমে বোমাসহ গ্রেপ্তারের খবর জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। জাতিসংঘের উদ্বেগ এই আশঙ্কায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পার করেছে, ঠিক এই সময়ে এ ধরনের ঘটনা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হোলি আর্টিজান হামলা ও সন্ত্রাসবাদ দমনের স্মৃতি এখনো তাজা। তাই সরকারের উচিত হবে অস্বীকারের রাজনীতিতে না গিয়ে এর যথাযথ ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

— বুলবুল সিদ্দিকী, নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং আহ্বায়কাবক, অ্যালায়েন্স ফর মাল্টিডিসিপ্লিনারি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস।