কুষ্টিয়া শহরের এনএস রোডে অবস্থিত কুষ্টিয়া হাইস্কুলের আব্দুল ওয়াহেদ সুপার মার্কেটটি এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। প্রায় পাঁচ দশক আগে নির্মিত এই ভবনের একপাশে হেলে পড়া, ছাদের পলেস্তারা খসে পড়া এবং কাঁপতে থাকা অবস্থা দেখে ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন।
১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মার্কেটে বর্তমানে প্রায় ৫০টি দোকান রয়েছে। নিরুপায় হয়েও দোকানিরা সেখানেই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে ভবনের বেহাল দশার খবর ছড়িয়ে পড়ায় ক্রেতাদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, মার্কেটের বিভিন্ন স্থানে পুরোনো কাঠামোর ক্ষয়চিহ্ন স্পষ্ট। দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণতার কারণে ছাদ ও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। দুই তলা বিশিষ্ট মার্কেটটির বারান্দা একদিকে হেলে পড়েছে এবং মানুষের চলাচলে ভবনটি কাঁপতে থাকে।
বিদ্যালয় ও মার্কেট সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে মার্কেটটির ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা নজরে আসলে বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানান। এরপর একজন প্রকৌশলী ভবনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। প্রকৌশলীর মতামত ছিল—পুরোনো কাঠামো সংস্কার করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়, ভবনটি সম্পূর্ণ নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। কিন্তু এখানেই জটিলতা তৈরি হয়েছে।
বিদ্যালয় সূত্র বলছে, মার্কেটের দোকানমালিকদের কাছ থেকে দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলক কম হারে ভাড়া নেওয়া হয়। ১৯৭৬-৭৭ সালের নির্ধারিত হারের ভিত্তিতে বর্তমানে অধিকাংশ দোকানের ভাড়া ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে। ফলে এই ভাড়া থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে এত বড় স্থাপনা নতুন করে নির্মাণ করা বিদ্যালয়ের পক্ষে সম্ভব নয়।
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগেই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা বা পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কারণ প্রতিদিনই সেখানে ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও ক্রেতাদের সমাগম ঘটে। ফলে ভবনটি ধসে পড়লে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে।
ব্যবসায়ী শরিফ বলেন, "প্রতিদিন দোকান খুলে বসি ঠিকই, কিন্তু মনে ভয় কাজ করে। ভবনের যে অবস্থা, কখন কী ঘটে বলা যায় না। ব্যবসা না করলে সংসার চলবে না, আবার দোকানে বসেও নিরাপদ বোধ করি না। এখন ক্রেতারাও ভবনের অবস্থা দেখে আগের মতো আসতে চান না।"
আরেক ব্যবসায়ী মমিন বলেন, "আমরা দীর্ঘদিন ধরে এখানে ব্যবসা করছি। মার্কেটটি পুরোনো, এখন ভবনের অবস্থা খুবই খারাপ। ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে, ভবন দুলে ওঠে। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। নতুন ভবন হলে ব্যবসায়ীরাও নিরাপদে ব্যবসা করতে পারবেন, ক্রেতারাও স্বস্তিতে আসবেন।"
স্থানীয় বাসিন্দা রাজন বলেন, "মার্কেটের ভবনটি যে ঝুঁকিপূর্ণ, তা বাইরে থেকেই বোঝা যায়। একপাশে হেলে আছে, পলেস্তারা খসে পড়ছে। এত মানুষের চলাচলের জায়গায় এমন একটি ভবন এভাবে পড়ে থাকা খুবই উদ্বেগের বিষয়। কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগেই ভবনটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার।"
কুষ্টিয়া হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক সাবানা ইয়াছমিন বলেন, "পুরোনো মার্কেটটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার বিষয়টি তিনি সংশ্লিষ্টদের অবহিত করেছেন। ব্যবসায়ীরা বিদ্যালয়কে মূলত জমির ভাড়া দেন। ১৯৭৬-৭৭ সালের হিসাবে ভাড়া নির্ধারিত ছিল এবং দীর্ঘ সময় পর পর সামান্য হারে তা বাড়ানো হয়েছে। ফলে কারও ভাড়াই ৫০০ টাকার বেশি নয়। এই আয় দিয়ে পুরো মার্কেট নতুন করে নির্মাণ করা বিদ্যালয়ের পক্ষে সম্ভব নয়। বর্তমান জেলা প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার পর তাকেও মার্কেটের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার কথা জানানো হয়েছে। গত ১১ আগস্ট জেলা প্রশাসক মার্কেটটি পরিদর্শন করেছেন।"
কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক ও বিদ্যালয়টির সভাপতি তৌহিদ বিন হাসান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "আমি ভবনটি দেখে এসেছি। ভবনটি পুরোনো, তাই প্রকৌশলীর মাধ্যমে এর বর্তমান অবস্থা পরীক্ষা করা হবে। প্রকৌশলী যদি ভবনটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন, তাহলে আমরা পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।"