জামালপুর পৌরসভার নির্বাচনের তপশিল এখনো ঘোষণা করা হয়নি। তবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপে শহরের রাজনীতি গরম হয়ে উঠেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে অন্তত ১০ জনের বেশি নেতার নাম আলোচনায় আসলেও, জেলা বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও বিভাজনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সহ অন্যান্য দল মাঠে তাদের অবস্থান শক্ত করতে তৎপর হয়েছে।

পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণির জামালপুর পৌরসভার আয়তন ৫৩ দশমিক ২৮ বর্গকিলোমিটার। এখানে মোট জনসংখ্যা ১ লাখ ৫৮ হাজার ৮৮৯ জন এবং ভোটার সংখ্যা ৯৬ হাজার ৩৫৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৪৬ হাজার ৯১৩ জন এবং নারী ভোটার ৪৯ হাজার ৪৪৪ জন। পৌরসভায় মোট ১২টি ওয়ার্ড, ৭৬টি মহল্লা এবং ৪২টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে।

দলীয় সূত্র ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতে, ক্ষমতাসীন দল বিএনপির অন্তত ৮ থেকে ১০ জন নেতা সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। এর মধ্যে জেলা যুবদলের সদস্য সচিব সোহেল রানা খান ও শহর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহ মোহম্মদ মাসুদ সবচেয়ে বেশি আলোচনার কেন্দ্রে। তাদের অনুসারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্যানার-পোস্টার এবং গণসংযোগের মাধ্যমে নিজেদের প্রার্থিতার পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তরুণ কর্মীদের মধ্যে সোহেল রানা খানের সক্রিয় উপস্থিতি তাকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে, শাহ মো. আব্দুলাহ আল মাসুদ তার ধারাবাহিক গণসংযোগ ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে আলোচনার কেন্দ্রে আছেন। তিনি জামালপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শাহ্ মো. ওয়ারেছ আলী মামুনের ছোট ভাই। এ ছাড়া জিএস ফিরোজ আহমেদ, রিশাদ রোদোয়ান বাবু, শামীম আহমেদ ও শুভ পাঠানসহ আরও কয়েকজন নেতার নাম সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় রয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর জেলা বিএনপির নেতৃত্ব ও কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল, তা এখনো নিরসন হয়নি। একাধিকবার পাল্টাপাল্টি অবস্থান, বিক্ষোভ, মশাল মিছিল এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন অডিও-ভিডিও বার্তা ও অভিযোগ দলীয় বিভক্তিকে আরও দৃশ্যমান করেছে।

নির্বাচনি আমেজ ও ভোটারদের প্রত্যাশা

শহরের নতুন ভোটার মো. সাকিব হাসান বলেন, "আমরা তরুণ ভোটাররা এবার ব্যক্তি নয়, কাজ দেখেই ভোট দিতে চাই। শহরের যানজট, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা এবং কর্মসংস্থান নিয়ে যার বাস্তব পরিকল্পনা থাকবে, তাকেই সমর্থন করব।"

নতুন ভোটার নুসরাত জাহান বলেন, "শুধু পোস্টার আর শোডাউন দেখে ভোট দেব না। আমরা চাই এমন একজন মেয়র, যিনি নারী, শিক্ষার্থী ও তরুণদের জন্য কাজ করবেন। দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি যোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ।"

পলাশতলার ভোটার আজিজুল হক বলেন, "অনেক তো ভোট দিয়েছি। কিন্তু যা দিয়েছি তাতে শুধু নেতাদের লাভ হয়েছে। আমাদের কোনো খোঁজ রাখেনি কেউ। ভোট নেওয়ার আগে সবাই আসে ভোটাভোটি শেষে সব শেষ। আমাদের দীর্ঘ দিনের পানি দুর্ভোগ কেউ দেখে না।"

শহরের রিকশা চালক মিজানুর রহমান বলেন, "শহরে প্রচুর রিকশা হয়ে গেছে। আমরা বাইরের রিকশার জন্য শহরের মানুষ রিকশাই চালাতে পারি না। যারা এই রিকশার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে এবার তাদেরকেই আমরা ভোট দেবো।"

প্রার্থীদের বক্তব্য

বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী শাহ মাসুদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "বিগত ১৭ বছর আন্দোলন-সংগ্রামে আমি সরাসরি মাঠে ছিলাম। দল যখন যে কর্মসূচি দিয়েছে, আমি আমার সংগঠন ও নেতাকর্মীদের নিয়ে রাজপথে ছিলাম। আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে আমি জামালপুরের রাজনীতিতে সর্বোচ্চ মামলার আসামিদের একজন। তাই আমি শতভাগ আশাবাদী যে দল আমার ত্যাগ ও ভূমিকার মূল্যায়ন করবে। পৌরসভার সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও পানি নিষ্কাশন। দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয় এবং জনগণ নির্বাচিত করে, তাহলে এই সমস্যার সমাধানকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেব।"

বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভক্তির বিষয়ে মাসুদ বলেন, "বিএনপির মধ্যে এখন কোনো কোন্দল নেই। এটি দেশের সবচেয়ে বড় ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল। এখানে একাধিক প্রার্থী থাকাটা স্বাভাবিক এবং এটাকে আমি প্রতিযোগিতা হিসেবেই দেখি। অতীতে কিছু মতপার্থক্য থাকলেও এখন সবাই দলকে শক্তিশালী করার জন্য কাজ করছে।"

মনোনয়ন ও নির্বাচনি সম্ভাবনা নিয়ে তিনি বলেন, "শহর বিএনপি, ওয়ার্ড বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা আমার সঙ্গে রয়েছেন। পাশাপাশি একজন প্রার্থীর নিজের গ্রহণযোগ্যতা ও ভোটব্যাংকও গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর রহমতে সেই অবস্থান আমার রয়েছে। তাই দল মনোনয়ন দিলে আমি বিজয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।"

বিএনপির সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী ও জেলা যুবদলের সদস্য সচিব সোহেল রানা খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "জামালপুর পৌরসভার উন্নয়ন, নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন এবং একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও পরিকল্পিত শহর গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েই আমি দীর্ঘদিন ধরে মানুষের পাশে আছি। রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে সবসময় জনগণের সুখ-দুঃখে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখার চেষ্টা করেছি। দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয়, তাহলে জনগণের প্রত্যাশাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করব।"

তিনি বলেন, "পৌরসভার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে জলাবদ্ধতা, ড্রেনেজ সংকট, যানজট, পরিচ্ছন্নতা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি। নির্বাচিত হলে এসব সমস্যা সমাধানে বাস্তবভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। আমি জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।"

বিএনপির অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সুযোগ হিসেবে দেখছে অন্যান্য দল। ইতোমধ্যে সাংগঠনিকভাবে মাঠে সক্রিয় হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির মেয়র প্রার্থী হিসেবে অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমানের নাম আলোচনায় রয়েছে।

তিনি বলেন, "আলহামদুলিল্লাহ, আমরা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। তবে নির্বাচনকে আমরা শুধু জয়-পরাজয়ের হিসাব হিসেবে দেখছি না। জনগণের আস্থা অর্জন করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী গণ মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তন হয়েছে। তারা এখন নেতা নির্বাচনের চেয়ে সৎ, দক্ষ ও যোগ্য সেবককে মেয়র হিসেবে পছন্দ করে। একারণে আমি আশাবাদী। বিএনপির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি বা তাদের কোনো দুর্বলতাকে কেন্দ্র করে রাজনীতি করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা আমাদের নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি, প্রার্থীর গ্রহনযোগ্যতা এবং জনগণের কাছে আমাদের কর্মসূচি ও অঙ্গীকার তুলে ধরেই ভোট চাইব। জনগণ যদি আমাদের যোগ্য মনে করে, তাহলে ইনশাআল্লাহ তারা আমাদের পক্ষেই রায় দেবেন।"

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকেও প্রার্থী চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আবিদ সৌরভকে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এনসিপির মেয়র প্রার্থী আবিদ সৌরভ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "আমি এনসিপি থেকে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। জামালপুরকে আধুনিক ও তরুণবান্ধব পৌরসভা হিসেবে গড়ে তুলতে ৩৬ দফা পরিকল্পনা ঘোষণা করেছি। এর মধ্যে পৌরসভার বিভিন্ন নাগরিক সেবা অনলাইনে আনার বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে। তরুণদের নিয়েই আমি কাজ করতে চাই। আমার বিশ্বাস, তরুণ প্রজন্ম ও সাধারণ মানুষ যদি প্রার্থীদের কাজ ও পরিকল্পনা বিবেচনা করেন, তাহলে আমি ভালো অবস্থানে থাকব।"

জোটের বিষয়ে তিনি বলেন, "নির্বাচনে এককভাবে নাকি জোটগতভাবে অংশ নেওয়া হবে, সেটি দলীয় সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। দল যে সিদ্ধান্ত নেবে, আমরা সেভাবেই এগোব।"

অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও এবার জামালপুর পৌরসভা নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা যায়। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও কয়েকজন পরিচিত মুখের নাম নগরীর রাজনীতিতে ঘুরছে। তবে তপশিল ঘোষণার পরই প্রার্থিতা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

জামালপুর জেলা নির্বাচন অফিসার মুহাম্মদ আনোয়ারুল হক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "এখনো স্থানীয় কোনো নির্বাচনে তপশিল ঘোষণা হয়নি। যেটুকু বলতে পারি আগে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হবে। পরে পৌরসভাসহ বাদ বাকি নির্বাচনগুলো। তাই পৌর নির্বাচনের তপশিলের পর এটির কার্যক্রম শুরু হবে।"