ধান ও জমি থাকা সত্ত্বেও ঝিনাইদহের কৃষকদের কাছে নেই নিজস্ব বীজ। একসময় যেমন মাটির মটকা বা বাঁশের গোলায় যত্ন করে পরের মৌসুমের বীজ সংরক্ষণ করা হতো, আজ তা বাজারের প্যাকেটজাত বীজে পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে সরকারি ও বেসরকারি বীজবাজারের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতা কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা।

জেলা কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঝিনাইদহে মোট আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ২৩৫ হেক্টর। প্রায় ১০ বছর আগে জেলার প্রায় ৯০ শতাংশ কৃষক নিজেদের উৎপাদিত ফসল থেকে বীজ সংরক্ষণ করতেন। বর্তমানে অধিকাংশ কৃষক কোম্পানি বা বাজার থেকে বীজ কিনে ব্যবহার করছেন। বিএডিসির বীজ সরবরাহ চাহিদার তুলনায় সীমিত হওয়ায় কৃষকদের একটি বড় অংশকে বেসরকারি কোম্পানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। জেলার বাজারে লাল তীর, এসিআই, বায়ারসহ বিভিন্ন কোম্পানির বীজ বিক্রি হচ্ছে।

শৈলকুপা উপজেলার হাজরামিনা গ্রামের কৃষক হাশেম হোসেন চলতি মৌসুমে ৩৫ বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন। সরকারি বীজের আশায় বিএডিসির অনুমোদিত ডিলারের কাছে গিয়েও প্রত্যাশিত বীজ পাননি তিনি। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় বাজার থেকে চড়া দামে বেসরকারি কোম্পানির হাইব্রিড বীজ কিনে বীজতলা তৈরি করেন।

একই উপজেলার কাঁচেরকোল গ্রামের কৃষক মসলেম উদ্দিন বলেন, "আগে ধান কাটার পর ভালো ধান থেকে বীজ আলাদা করে মটকা বা গোলায় সংরক্ষণ করা হতো। এখন সেই অভ্যাস কমে গেছে। প্রতি মৌসুমেই বাজার থেকে বীজ কিনতে হচ্ছে।"

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষকের ঘরে বীজ না থাকার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি দেখা দেয় সংকটের সময়ে। বাজারে বীজের সরবরাহ কমে গেলে বা দাম বেড়ে গেলে কৃষকের হাতে তাৎক্ষণিক কোনো বিকল্প থাকে না। নিম্নমানের বা নকল বীজে অঙ্কুরোদগম না হলে শুধু বীজের দামই নয়, জমি প্রস্তুত, শ্রম, সার, কীটনাশক ও সেচের পুরো খরচই ঝুঁকিতে পড়ে। এতে চাষাবাদ পিছিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কৃষকের আর্থিক ক্ষতিও বাড়ে।

উচ্চফলনের আশায় অনেক কৃষক হাইব্রিড বীজের দিকে ঝুঁকছেন। তবে হাইব্রিড বীজ থেকে উৎপাদিত ফসলের বীজ পরবর্তী মৌসুমে একই বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে ব্যবহার করা যায় না। ফলে কৃষককে প্রায় প্রতি মৌসুমেই নতুন বীজ কিনতে হয়।

এদিকে ঝিঙাশাইল, লতিশাইল, কাটারিভোগ, রাজাশাইল, দুধকলম, বাঁশফুল ও রূপশাইলসহ বিভিন্ন স্থানীয় ধানের জাত বিলুপ্ত বা বিলুপ্তপ্রায় হয়ে পড়েছে। একইভাবে কমে যাচ্ছে স্থানীয় ডাল, তিল, সরিষা ও সবজির বিভিন্ন জাত।

শৈলকুপার দামুকদিয়া গ্রামের কৃষক মাসুদ মোল্লা বলেন, "আগে ভালো ধান আলাদা করে রেখে পরের মৌসুমে বীজ হিসেবে ব্যবহার করতাম। এখন কোম্পানির বীজ কিনতে হয়। নিজের বীজ রাখার অভ্যাসও অনেকটা চলে গেছে।"

কালীগঞ্জের কৃষক আব্দুল খালেক বলেন, "নিজের ঘরে বীজ মজুত থাকলে চাষাবাদের খরচ কমে যায়। এখন বীজ কিনতে গিয়ে কৃষকের লাভের অংশ কমে যাচ্ছে।"

ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, "কৃষকদের মানসম্মত বীজ ব্যবহারের পাশাপাশি নিজেদের উৎপাদিত ভালো ফসল থেকে বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।" তিনি বলেন, "ভালো ও রোগমুক্ত জমি থেকে উপযুক্ত সময়ে বীজ সংগ্রহ করে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারলে কৃষক পরবর্তী মৌসুমে নিজের বীজ ব্যবহার করতে পারবেন। এতে বীজ কেনার খরচ কমার পাশাপাশি বাজারের ওপর নির্ভরশীলতাও কমবে।"