বাগেরহাটের কৃষক ও মৎস্যজীবীদের স্বপ্নবাজার হিসেবে নির্মিত জেলায় প্রথম হিমাগারটি এখন কেবল আলু সংরক্ষণের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সাড়ে পাঁচ একর জমির ওপর চারটি শেড বিশিষ্ট এই অবকাঠামোর মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা ৩ হাজার ২০০ টন। তবে কার্যক্রম শুরু থেকেই মাছ, সবজি ও ফল সংরক্ষণের লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় বর্তমানে মাত্র দুটি শেডে প্রায় ১৪ হাজার বস্তা আলু রাখা হচ্ছে। বাকি দুটি শেড নিষ্ক্রিয় রয়েছে।

বাগেরহাট শহরের মুনিগঞ্জ এলাকার হাড়িখালীতে অবস্থিত ‘বি.ই কোল্ড স্টোরেজ অ্যান্ড এগ্রো প্রসেসিং লিমিটেড’ প্রতিষ্ঠানটি ২০২২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনের সময় উদ্যোক্তারা জানান, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সাদা মাছ, ইলিশ, বিভিন্ন ধরনের ফল ও সবজি সংরক্ষণ করে কৃষক ও মৎস্যজীবীদের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। এর মাধ্যমে উৎপাদনের পরপরই কম দামে বিক্রি করার চাপ থেকে মুক্তি পেয়ে উপযুক্ত সময়ে বাজারজাত করার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হয়েছিল।

তবে বাস্তবতা ভিন্ন ছিল। কার্যক্রম শুরুর পর মাছ সংরক্ষণ লাভজনক না হওয়ায় তা বন্ধ হয়ে যায়। একইভাবে সবজি ও ফল সংরক্ষণের পরিকল্পনাও যথাযথভাবে এগোয়নি। ফলে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে আলু সংরক্ষণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বর্তমানে প্রতি বস্তা আলু মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সংরক্ষণের জন্য ৩০০ টাকা নেওয়া হয়।

কোল্ড স্টোরেজে আলু সরাসরি হিমঘরে রাখা হয় না। প্রথমে ‘প্রি-কুলিং’ প্রক্রিয়ায় আলুর তাপমাত্রা কমিয়ে আনা হয়। এরপর অতিরিক্ত পানি ঝরিয়ে নির্দিষ্ট নিয়মে তা সংরক্ষণ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় নষ্ট বা বাজারে বিক্রির অনুপযোগী আলু আলাদা করে ফেলা হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব আলু পরবর্তীতে মাছের খামারে খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী বাগেরহট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি লিয়াকত হোসেন লিটন। ২০২২ সালে উদ্বোধনের সময় তিনিই স্বত্বাধিকারী ছিলেন। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে লিয়াকত হোসেন লিটন এলাকায় নেই। তার অনুপস্থিতিতে জি এম মো. মিজানুর রহমানের তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান কার্যক্রম, বিদ্যুৎ বিলের ব্যয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে জিএম মো. মিজানুর রহমান কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে প্রায় ২০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। আলু ওঠানো-নামানো, বস্তাবন্দী, পরিবহন ও হিমঘরে সংরক্ষণের কাজে তাঁরা নিয়োজিত। নারী শ্রমিকদের দৈনিক বেতন প্রায় ৩০০ টাকা এবং পুরুষ শ্রমিকরা প্রতি বস্তা আলু নামানোর জন্য ৩৫ টাকা করে মজুরি পান। তবে আলু সংরক্ষণের মৌসুম ছাড়া বছরের অন্য সময়ে কাজের চাপ অনেকটাই কমে যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা সাগর শেখ বলেন, "কোল্ড স্টোরেজটি যখন চালু হয়, তখন আমরা আশা করেছিলাম যে এলাকার কৃষকেরা তাদের মাছ, সবজি ও অন্যান্য পণ্য সংরক্ষণ করতে পারবেন। এতে কৃষকেরা উপকৃত হবেন এবং এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যও বাড়বে। কিন্তু এখন কার্যক্রম অনেকটাই সীমিত হয়ে গেছে।"

অন্যদিকে, স্থানীয় ব্যবসায়ী রায়হান শেখ বলেন, "চারটি শেড নিয়ে এত বড় একটি প্রতিষ্ঠান করা হয়েছিল। অথচ এখন দুটি শেডে আলু রাখা হচ্ছে, অন্যগুলো তেমন ব্যবহার হচ্ছে না। হিমাগারটি পুরোপুরি চালু থাকলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা আরও বেশি সুবিধা পেতেন।"

বাগেরহট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন বিষয়টি নিয়ে বলেন, "স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষিপণ্য সংরক্ষণের সুযোগ থাকলে কৃষকেরা উৎপাদনের পরপরই কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন না। সংরক্ষণ করে উপযুক্ত সময়ে বাজারজাত করতে পারলে তারা ভালো দাম পান। বাগেরহাটে এ ধরনের সংরক্ষণ সুবিধা কৃষি ও কৃষিভিত্তিক ব্যবসার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।"

তিনি আরও যোগ করেন, "হিমাগারটির পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো গেলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সবজি ও ফলসহ বিভিন্ন পচনশীল পণ্য সংরক্ষণের সুযোগ বাড়বে। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা উপকৃত হওয়ার পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।"

মাছ, সবজি ও ফল সংরক্ষণের সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে কৃষি ও মৎস্য খাতে নতুন সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করা এই হিমাগারটি চার বছর পরেও পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারেনি। বড় অবকাঠামোর অর্ধেক অংশ অব্যবহৃত থাকায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম কেবল আলু সংরক্ষণেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।