নীলফামারীতে ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে হিমাগারগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তীব্র গ্রীষ্মকালে বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি ও জেনারেটরের অকার্যকারিতার কারণে জেলার ১১টি হিমাগারে সংরক্ষিত প্রায় ৭৭ হাজার টন আলু নষ্টের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ৪০ হাজার টন বীজ আলু নষ্ট হলে আগামী মৌসুমে কৃষিখাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

হিমাগারে আলু সংরক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখা অপরিহার্য, যা নিশ্চিত করতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রয়োজন। তবে কয়েক দিন ধরে বিদ্যুৎ চলাচল স্বাভাবিক নেই। বিদ্যুৎ চলে গেলেই জেনারেটর চালিয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হলেও বাইরের উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে কাঙ্ক্ষিত তাপমাত্রায় ফিরে আসতে দীর্ঘ সময় লাগছে। ফলে পরিচালন ব্যয় বেড়েছে কয়েকগুণ।

অংকুর হিমাগারের ব্যবস্থাপক সুফি হায়দার বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, "হিমাগারের বিভিন্ন মেশিন নির্দিষ্ট সময় ধরে চালাতে হয়। এর মধ্যে বিদ্যুৎ চলে গেলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। মেশিন চালু করার পর মাঝপথে বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো প্রক্রিয়াটি ব্যাহত হয় এবং পরে আবার শুরু থেকে কাজ করতে হয়। এতে বিদ্যুৎ বিল ও শ্রম—দুটিরই অপচয় হয়। আর দীর্ঘ সময় জেনারেটর চালিয়ে এই আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।"

হিমাগার মালিকদের পাশাপাশি কৃষক ও আলু ব্যবসায়ীদের মধ্যেও উদ্বেগ ছড়িয়েছে। পরবর্তী মৌসুমের বীজ হিসেবে আলু সংরক্ষণকারী কৃষক জাহিদুল ইসলাম জানান, "পরবর্তী বছর জমিতে রোপণের জন্য হিমাগারে আলু রেখেছি। কিন্তু বিদ্যুতের যে অবস্থা, শুনছি অনেকের আলু নাকি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমার আলুর কী অবস্থা, কে জানে! যদি বীজ নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে পরের মৌসুমে ভালো ফসল পাওয়া কঠিন হবে। আমরা চাই হিমাগারগুলোতে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হোক, যাতে আমাদের বীজ নিরাপদে থাকে।"

অন্যদিকে, কৃষক রশিদুল ইসলাম বলেন, "দিনের অর্ধেক সময়ই এখানে বিদ্যুৎ থাকে না। হিমাগার মালিকেরা জেনারেটর দিয়ে যথেষ্ট চেষ্টা করছেন। কিন্তু জেনারেটর দিয়ে সব মেশিনের পুরো লোড নেওয়া সম্ভব হয় না বলে আমাদের জানিয়েছেন হিমাগারের লোকেরা। আলু নষ্ট হলে এই দায়ভার কে নেবে? বিপদে পড়ব আমরা সাধারণ মানুষ। এখন আল্লাহর ওপর ভরসা করা ছাড়া আমাদের আর কিছু করার নেই।"

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নীলফামারীতে প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৫৩ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। চাহিদা ও সরবরাহের এই বিশাল ফাঁক লোডশেডিং বাড়িয়ে দিচ্ছে। উত্তরা হিমাগার নীলফামারীর ব্যবস্থাপক দীপু রায় বলেন, "বর্তমান আবহাওয়া অনেক গরম। গরমের কারণে এমনিতেই হিমাগারের তাপমাত্রা বেড়ে যায়, ফলে মেশিনগুলো বেশি সময় চালাতে হয়। এর মধ্যে মাঝপথে লোডশেডিং হলে পুরো পরিশ্রমই বৃথা যায়। একটি রুম ঠান্ডা করতে যদি এক ঘণ্টা সময় লাগে, সেখানে ৩০ মিনিট মেশিন চলার পর বিদ্যুৎ চলে গেলে আবার শুরু থেকে হিসাব করতে হয়। এতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচ হয়, আর জেনারেটর ব্যবহার করলে খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।"

তিনি আরও বলেন, "আমাদের ওপর হিমাগার ভাড়া বেশি নেওয়ার অভিযোগ আসে। কিন্তু সরকারকেও আমাদের দিকটা দেখতে হবে। বিদ্যুৎ সংকটে পরিচালন ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে। আমরা চাই হিমাগারগুলোতে সঠিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হোক। এতে হিমাগার মালিকেরা যেমন ক্ষতি থেকে বাঁচবেন, তেমনি কৃষকেরাও নিরাপদে তাদের আলু সংরক্ষণ করতে পারবেন।"