বয়স ৩৫ বছর হলেও শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার কারণে অন্য কোনো কাজে অক্ষম জনি মোল্লা। দীর্ঘ আট বছর ধরে বাগেরহাট সদর উপজেলার যাত্রাপুর বাজারসংলগ্ন কুলিয়া দাইড় খেয়াঘাটে নৌকার দড়ি টেনে মানুষ পারাপার করছেন তিনি। প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ঘাটে থাকে এই প্রতিবন্ধী যুবক। তার আদায়কৃত দিনমজুরি ৪০০ টাকা পুরোপুরি বাবার হাতে তুলে দেন, যাতে পরিবারের ছয় সদস্যের সংসার চলে.
বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের কুলিয়া দাইড় গ্রামের বাসিন্দা জনি মোল্লার বাবা মনি মোল্লা। ছোটবেলা থেকেই নদী ও নৌকার সংস্পর্শে থাকলেও শারীরিক ও মানসিক সমস্যার কারণে তিনি নিয়মিত চাকরি বা ব্যবসা করতে পারেন না। ভৈরব নদীর ওপর অবস্থিত এই ঘাটটি আশপাশের কয়েকটি গ্রামের শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম। প্রতিদিন প্রায় ৭০০ মানুষ এই ঘাট ব্যবহার করে নদী পারাপার হন। নৌকা এসে দাঁড়ালেই শুরু হয় জনির কাজ। মোটা দড়ি ধরে নদীর এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে টানতে থাকেন তিনি। নদীর স্রোত, রোদ বা বৃষ্টি—কোনো আবহাওয়াই তার কর্মযাত্রা থামাতে পারে না।
জনি মোল্লা বলেন, "ছোটবেলা থেকেই নৌকা চালাই। এই ঘাটে প্রায় আট বছর ধরে কাজ করছি। আমার শারীরিক ও মানসিক সমস্যা আছে। তারপরও সংসারের জন্য কাজ করতে হয়। আমার পরিবারের ছয়জন সদস্য। দিনে ৪০০ টাকা পাই। এই টাকা পুরোটা আব্বুর হাতে দিয়ে দিই। আব্বু এই টাকা দিয়ে সংসার চালান। সকাল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ঘাটে থাকি।"
প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় ঘাটে উপস্থিত থাকলেও শারীরিক ও মানসিক সমস্যার কারণে তিনি সবসময় একটানা কাজ করতে পারেন না। সুস্থ থাকলে নৌকা চালান, অসুস্থ হলে কিছুটা বিরতি নেন। তবুও পরিবারের কথা মাথায় রেখে সুযোগ পেলেই আবার দড়ি ধরেন। ঘাটে নিয়মিত যাতায়াতকারী মনিরা বেগম বলেন, "জনির বয়স ৩২-৩৩ বছরের মতো হবে। দেখলে বোঝা যায় না। ওর শারীরিক সমস্যা আছে, একটু মানসিক সমস্যাও আছে। এই খেয়া টানা ছাড়া অন্য কোনো কাজ করতে পারে না। সাত-আট বছর ধরে এই কাজ করেই সংসার চালাচ্ছে। আগে বাবার সঙ্গে জাল ধরত। এখন খেয়া টেনেই সংসার চলে। গরিব ও প্রতিবন্ধী মানুষটাকে যদি একটু আর্থিক সহযোগিতা করা যায়, তাহলে ভালোভাবে চলতে পারবে।"
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মো. মেহেদী হাসান বলেন, "অনেকদিন ধরে জনিকে এই নৌকা চালাতে দেখছি। ছেলেটার মানসিক সমস্যা আছে। অন্য কোনো কাজ করতে পারে না। তারপরও নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এই কাজ করে যাচ্ছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নদীর ঘাটে পড়ে থাকে।"
ঘাটের ইজারাদার মো. মাসুম মোল্লা বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, "জনি দীর্ঘদিন ধরে এখানে দড়ি টেনে মানুষ পারাপারের কাজ করছে। ওকে তিন বেলা খেতে দিই, চা-নাশতা দিই এবং ৪০০ টাকা বেতন দিই। সব মিলিয়ে প্রতিদিন ওর পেছনে প্রায় ৫০০ টাকা খরচ হয়। ভোর ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত যখন সুস্থ থাকে, তখন খেয়া চালায়।" তিনি আরও বলেন, "জনি প্রতিবন্ধী ও খুবই গরিব। ওর কোনো জায়গা-জমি নেই, নিজের বলতে কিছুই নেই। ওর বাবা মাছ ধরে। জনি যে ৪০০ টাকা পায়, সেটাও পুরোটা বাবার হাতে তুলে দেয়। সেই টাকা দিয়েই সংসার চলে। ওর পরিবারে ছয়জন সদস্য। যদি জনিকে একটু সাহায্য-সহযোগিতা করা যায়, তাহলে সে আরও ভালোভাবে বাঁচতে পারবে।"
স্থানীয়দের জানামতে, ছোটবেলা থেকেই নদী ও নৌকার সংস্পর্শে থাকলেও শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার কারণে জনি অন্য কোনো পেশায় যুক্ত হতে পারেননি। তবুও পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে নিয়মিত এই কষ্টকর কাজটি করছেন তিনি।