র‌্যাব-৬ এর অভিযানে খুলনার আলোচিত সন্ত্রাসী গ্রুপ ‘আরমান বাহিনী’র প্রধান আরমান হোসেন দিপু ওরফে ‘শুটার আরমান’ গ্রেপ্তার হয়েছেন। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ফরিদপুরের বোয়ালমারী এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি শটগান ও ১২ রাউন্ড শটগানের গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সকালে খুলনা সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-৬ এর উপঅধিনায়ক ও কোম্পানি কমান্ডার মেজর মো. নাজমুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, খুলনা মহানগরীর দৌলতপুর, খালিশপুর, আড়ংঘাটা, দিঘলিয়া ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার ও ভয়ভীতি প্রদর্ষণের অভিযোগ রয়েছে আরমান বাহিনীর বিরুদ্ধে।

তদন্তে জানা যায়, স্থানীয়ভাবে ‘শুটার আরমান’ নামে পরিচিত আরমান হোসেন দিপু ওরফে আরমান ওরফে আরমিন প্রথমে অন্য একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে সেখান থেকে আলাদা হয়ে নিজস্ব বাহিনী গড়ে তোলেন এবং ৮ থেকে ১০ জন সদস্য নিয়ে ‘আরমান বাহিনী’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া গেলেও ভুক্তভোগীরা সন্ত্রাসীদের ভয়ে থানায় নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক থাকায় অনেক ঘটনা ‘ক্লুলেস’ থেকে যায়। তবে হোয়াটসঅ্যাপ যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন উপাত্ত বিশ্লেষণ ও ভুক্তভোগীদের সরাসরি দেওয়া তথ্যের সাহায্যে র‌্যাব জড়িতদের শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, আরমান বাহিনী বিদেশি মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে হোয়াটসঅ্যাপে ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে চাঁদা দাবি করত। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তারা ভয়ভীতি প্রদর্শন, ব্যবসা বন্ধ করার হুমকি দেওয়া এমনকি গুলি করে হত্যার ভয় দেখাত। আরমান নিজে কোনো সিম ব্যবহার না করে পকেট রাউটারের মাধ্যমে যোগাযোগ করায় প্রচলিত পদ্ধতিতে তাকে শনাক্ত করা কঠিন ছিল। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় যোগাযোগের এই মাধ্যমগুলো বিশ্লেষণ করেই তার অবস্থান নিশ্চিত হন র‌্যাব কর্মকর্তারা। এছাড়া তাদের কর্মকাণ্ডের প্রচারণায় ব্যবহৃত ফেসবুক পেজের তথ্যও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

গত ১৭ জুন খুলনার দৌলতপুরে একটি মসজিদে ঢুকে দুই মুসল্লিকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার ঘটনায়ও আরমানের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। ওই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে তাকে স্পষ্টভাবে দেখা যায় এবং ভিডিওটি ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে জিজ্ঞাসাবাদে আরমান প্রথমে ওই ঘটনায় তার উপস্থিতির কথা স্বীকার করেন। পরে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে। তবে মসজিদে গুলির ঘটনাটি এখনো তদন্তাধীন রয়েছে।

র‌্যাবের তথ্য অনুযায়ী, আরমান হোসেন দিপুর বিরুদ্ধে খুলনা মহানগরীর বিভিন্ন থানায় হত্যা ও হত্যাচেষ্টাসহ একাধিক মামলার তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে মামুন মোল্যা হত্যা মামলা (২৫ জানুয়ারি ২০২১), মারজান মুন্না হত্যা মামলা (৩০ জুন ২০২২), কালা রানা হত্যা, ঘাটরা রাজিব হত্যা (৩১ জানুয়ারি ২০২৬), যুবদল নেতা রাশু হত্যা (১৯ মার্চ ২০২৬), মনিরুল ইসলাম রনি হত্যা (২৮ আগস্ট ২০২৬) এবং ১৭ জুন দৌলতপুরের মসজিদে দুই মুসল্লিকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার ঘটনা উল্লেখযোগ্য। তবে এসব মামলার কয়েকটিতে আরমানকে সন্দেহভাজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

আরমানের গ্রেপ্তারের পর তার সহযোগীদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার কাজ চলছে। আরমান বাহিনীর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগের বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়ার আশায় সংস্থাটি। আরমানের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ধার করা অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে পৃথক আইনি কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলোর তদন্তও অব্যাহত রয়েছে।