তিন দশকে দুইবার পদ্মার ভাঙনে বসতঘর-জমি হারিয়ে এখন প্রায় নিঃস্ব আব্দুস সামাদ সরদার। দুই দফায় ভাঙনের পর ঠাঁই নিয়েছেন কাওয়ালজানি গ্রামে। সেখানে অবশিষ্ট যতটুকু জমি আছে, সেটাও এবার পদ্মা নদীর গর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় পড়েছে।

৮৫ বছর বয়সী আব্দুস সামাদ সরদার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘এখন ভাঙলে যাওনের আর কোনো জায়গা নাই।’

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের কাওয়ালজানি গ্রামে বসবাস করছেন আব্দুস সামাদ সরদার। তিনি বলেন, আগে তাঁর বাড়ি ছিল দেবগ্রাম এলাকায়। ৩০ বছর আগে ভাঙনে সব হারিয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে বেথুরী এলাকায় বাড়ি করেন। সেখানে তাঁর জমিজমায় অনেক লোক কাজ করতেন। সেই বাড়িও ভেঙে গেছে ১৮ বছর আগে। বর্তমানে কাওয়ালজানি গ্রামের এখানেও নদীভাঙন ঘরের কোনায় ঠেকেছে। ভাঙনের কবলে যেকোনো সময় বাড়ি সরাতে হবে।

আব্দুস সামাদ সরদারের মতো দেবগ্রাম ও কাওয়ালজানি গ্রামের প্রায় ১০০ মানুষের বাড়িঘর ভাঙনের ঝুঁকির মধ্যে। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে পদ্মার ভাঙন বেড়েছে। নদীতে পানি বাড়া ও কমার সময় ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। ভাঙনের কবলে পড়েছে স্থানীয় মুন্সি বাজার, দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি মসজিদ, কবরস্থান, উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থাপনা।

ভাঙনের কবলে থাকা স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দেবগ্রাম ইউনিয়নে এক সপ্তাহে পদ্মার ভাঙনে তীরের প্রায় ১১০ বিঘা আবাদি বিলীন হয়েছে। যেসব জমি বিলীন হয়েছে, সেসব জমিতে ধান, পাট, পেঁয়াজ, মরিচসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ হতো।

৩ সেপ্টেম্বর দেবগ্রাম ও কাওয়ালজানি গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, পদ্মা নদীর তীব্র স্রোতের সঙ্গে বড় বড় ঢেউ তীরে আছড়ে পড়ছে। আর এতে ভেঙে পড়ছে কৃষিজমি। কোথাও কোথাও বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে, স্রোত ও ঢেউয়ের তোলে জিও ব্যাগ নদীতে ধসে যাচ্ছে। নদীর কিনারেই একটি কবরস্থান। নদী থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে ২৭ নম্বর বেথুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের টিনশেড ঘর, ১২০ গজ দূরে মুন্সি বাজার ও একটি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র। এ ছাড়া আরও একটু দূরে ১৪ নম্বর কুশাহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও ঝুঁকির মুখে আছে।

নদীপাড়ের বাসিন্দা লোকমান সরদার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তাঁর ১০ বিঘার মতো জমি ছিল, ভাঙনে বিলীন হয়েছে। এখন এক বিঘা মাত্র জমি আছে। তাঁর ছেলে, দাদা-দাদির কবর যেকোনো মুহূর্তে বিলীন হয়ে যাবে। এখন একটাই চাওয়া নদীশাসন। বহু বছর ধরে শুনছেন, নদীশাসন হচ্ছে, হবে। কিন্তু তা কবে হবে, তা কেউ জানেন না। ১৯৭৩ সালে স্থাপিত ২৭ নম্বর বেথুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠানটি দুইবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছে। গত বছর বিদ্যালয় থেকে নদী প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ছিল। এ বছর বিদ্যালয়টি ভাঙন ঝুঁকিতে পড়েছে।

বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নূর মোহাম্মদ সরদার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তাঁদের রিলিফ-স্লিপের প্রয়োজন নেই। জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন ঠেকাতে সরকারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

ভরা বর্ষায় ভাঙন প্রকট আকার ধারণ করলে তখন তড়িঘড়ি করে জিও ব্যাগ ফেলা হয়। নদীর তীর ঘেঁষে উপরিভাগে জিও ব্যাগ পড়লেও স্রোতের টানে নিচের দিকে মাটিসহ ধসে পড়ে।

ভাঙনে এক সপ্তাহে দেবগ্রাম এলাকার প্রায় ১২০ মিটার অংশ বিলীন হয়েছে উল্লেখ করে রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. তাজমিনুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, জরুরি ভিত্তিতে ৭২ মিটার এলাকায় বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলতে একটি প্যাকেজের প্রস্তাব পাউবোর  প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। এর আগে বর্ষার শুরুতে একটি প্যাকেজে ৬ হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। আর গত বছর দুটি প্যাকেজে ১২ হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হয়।

অপরিকল্পিত ও দায়সারা বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার কারণে টেকসই হচ্ছে না মনে করছেন স্থানীয় লোকজন। দৌলতদিয়া ও দেবগ্রাম এলাকার নদীশাসন আন্দোলনের সদস্যসচিব জামাল মুন্সি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ভরা বর্ষায় ভাঙন প্রকট আকার ধারণ করলে তখন তড়িঘড়ি করে জিও ব্যাগ ফেলা হয়। নদীর তীর ঘেঁষে উপরিভাগে জিও ব্যাগ পড়লেও স্রোতের টানে নিচের দিকে মাটিসহ ধসে পড়ে। অথচ সারা বছর শুষ্ক মৌসুমে ভাঙন প্রতিরোধের দাবি জানিয়ে এলেও কেউ কর্ণপাত করেন না।