মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) রংপুর বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায়ীকে বিদেশে পালাতে সহায়তা করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। কয়েক লাখ টাকা ঘুস গ্রহণ করে চার্জশিটে ভুল তথ্য যুক্ত করে পুলিশের ‘পিসিপিআর’ (পূর্ববর্তী অপরাধের রেকর্ড) থেকে আসামির নাম বাদ দেওয়া হয়, যা তাকে বিদেশে পালিয়ে যেতে সুযোগ করে দেয়।
অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন ডিএনসি রংপুর বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক দিলারা রহমান এবং উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মেহেদুল ইসলাম সরদার। অন্যদিকে, এই কৌশলে বিদেশে পালিয়ে যাওয়া মাদক কারবারি হলেন মিঠাপুকুর উপজেলার বালুচর কাশিনাথপুর এলাকার হাতিমপুর গ্রামের আব্দুল লতিফের ছেলে মো. মোরছালিন মিয়া (৩২)। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মোরছালিন এলাকায় মাদক ব্যবসা চালিয়ে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন।
মোরছালিনের প্রতিবেশী মুশফিকুর জানান, "মোরছালিন এলাকার যুবসমাজকে ধ্বংস করে দিয়েছে। সে বলত, টাকা দিয়ে পুলিশ, উকিলে ও আদালতকে কিনে নেয় সে। তাকে কেউ আটকাতে পারবে না। একসময় সে আমার হাত ভেঙে দিয়েছিল, স্ত্রীর মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল। ওর ভয়ে এলাকায় কেউ কথা বলার সাহস পায় না।"
গত বছরের ৮ জুলাই রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার জুমা খানপাড়ায় অভিযান চালিয়ে ডিএনসি’র একটি দল ৮৭০ গ্রাম ওজনের ৯ হাজার পিস ইয়াবা সহ নাজমা বেগম (২৬) নামের এক নারীকে গ্রেপ্তার করে। ওই সময় তার স্বামী খালেদ খান ও প্রধান হোতা মোরছালিন মিয়া পালিয়ে যান। এ ঘটনায় মিঠাপুকুর থানায় মামলা করেন ডিএনসি’র এসআই মো. আলমগীর হোসেন।
বদলিজনিত কারণে গত বছরের ২১ আগস্ট মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করেন এসআই মো. মেহেদুল ইসলাম সরদার। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ও উপপরিচালক দিলারা রহমান যোগসাজশ করে চার্জশিটের ৩ নম্বর কলামে (দোষী আসামির তালিকা) নাম না দিয়ে ২ নম্বর কলামে (অব্যাহতিপ্রাপ্ত আসামি) মোরছালিন ও খালেদের নাম বসিয়ে দেন। ফলে আদালতের সফটওয়্যার সিস্টেমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তারা পিসিপিআর থেকে অব্যাহতির তালিকায় চলে যান।
এছাড়া, এজাহারে কক্সবাজার থেকে ইয়াবা এনে মজুতের কথা থাকলেও চার্জশিটে প্রধান কারবারি মোরছালিনকে ‘সহযোগিতাকারী’ হিসেবে দেখানো হয়। এমনকি মোরছালিনের জীবিত বাবাকেও মৃত উল্লেখ করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।
এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে গত ২১ আগস্ট সানজিলা মুনতাসির ট্রাভেলসের মাধ্যমে ওমরাহ ভিসায় ইউএস-বাংলার ফ্লাইটে সৌদি আরব চলে যান মোরছালিন। ১৯ সেপ্টেম্বর তার দেশে ফেরার কথা থাকলেও সেখানে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুরের সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "চার্জশিটে ভুল কলামে নাম দিয়ে আসামিকে পালানোর সুযোগ দেওয়ার পেছনে তদন্তকারী কর্মকর্তা ও স্বাক্ষরকারী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা— উভয়েই সমান অপরাধী। এটি সরকারি চাকরি বিধিমালার চরম লঙ্ঘন। তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।"
কোর্টের সিএসআই এএফএম সাখাওয়াত হোসেন জানান, "অভিযোগপত্রে আসামিদের অভিযুক্ত করা হলেও অব্যাহতির কলামে নাম দেওয়ায় সফটওয়্যারে তাদের অব্যাহতির তথ্য দেখাচ্ছে। এতে পুলিশের পিসিপিআর থেকেও নাম কাটা পড়ে, যার সম্পূর্ণ দায় তদন্তকারী কর্মকর্তার।"
ঘুস গ্রহণের বিষয়টি অস্বীকার করে এসআই মেহেদুল ইসলাম সরদার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "আমরা তো আদালতে চার্জশিট জমা দিয়েই দায় শেষ করি। এর আগে সিরাজগঞ্জেও এভাবে চার্জশিট দিয়েছি, কোনো সমস্যা হয়নি। বাবার নামের ভুলের বিষয়টি আগের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে হয়েছে।"
দায়িত্বে অবহেলার প্রশ্ন তুললে উপপরিচালক দিলারা রহমান বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। মুক্তকণ্ঠকে তিনি বলেন, "এ বিষয়ে আমি কোনো কথা বলব না। আমরা এভাবেই প্রতিবেদন দিই।"