জরুরি সেবার বিল ও নির্ধারিত ফি পরিশোধের সুবিধার্থে ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকার তাৎক্ষণিক ঋণ সুবিধা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই ঋণের অর্থ নগদে তোলা যাবে না; সরাসরি বিল বা ফি পরিশোধে ব্যবহার করতে হবে। ইতিমধ্যে এ সংক্রান্ত নীতিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে।

ডিজিটাল লেনদেন উৎসাহিত করতে এবং গ্রাহকদের সাময়িক অর্থের সংকট দূর করতেই এই পদক্ষেপ। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, জরুরি চাহিদা মেটাতে ৫০ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়া যাবে। সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মেয়াদে এই ঋণ পরিশোধ করতে হবে এবং মেয়াদের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট মাশুল প্রযোজ্য হবে। ব্যাংকগুলোর অ্যাপের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে এই ঋণের আবেদন করা যাবে। তবে যে সেবার জন্য যতটুকু অর্থ প্রয়োজন, ঠিক ততটুকুই ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে। প্রথম ছয় মাস পরীক্ষামূলকভাবে এই কার্যক্রম চলবে, এরপর তা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে।

‘ই-পেমেন্ট ক্রেডিট’ নামের এই সুবিধার আওতায় গ্রাহকেরা পরিষেবা বিল, মুঠোফোনে রিচার্জ, শিক্ষা ফি, চিকিৎসা ব্যয়, সঞ্চয়ের কিস্তি, বিমার প্রিমিয়াম, ভ্রমণ খরচ, কর ও সরকারি সেবার ফি পরিশোধের জন্য ঋণ নিতে পারবেন। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত অন্যান্য ব্যয় বা মাশুলের জন্যও এই ঋণ পাওয়া যাবে।

ঋণের অর্থ গ্রাহকের ব্যক্তিগত হিসাব বা ডিজিটাল ওয়ালেটে জমা হবে না। ডিজিটাল লেনদেনব্যবস্থার মাধ্যমে সরাসরি নির্ধারিত সেবাদাতা বা বিল গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে অর্থ পরিশোধ করতে হবে। আবেদন থেকে শুরু করে গ্রাহক যাচাই, অর্থ পরিশোধ এবং ঋণ ফেরত নেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে।

ঋণের মেয়াদ হবে ৭ দিন, ১৫ দিন কিংবা ৩০ দিন। ঋণের পরিমাণ ও মেয়াদ অনুযায়ী সর্বোচ্চ মাশুল নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সূত্র অনুযায়ী, ৫০ থেকে ২৫০ টাকা ঋণের ক্ষেত্রে ৭, ১৫ ও ৩০ দিনের সর্বোচ্চ মাশুল যথাক্রমে ৩, ৪ ও ৬ টাকা। ২৫১ থেকে ৫০০ টাকার জন্য মাশুল ৫, ৮ ও ১৫ টাকা। ৫০১ থেকে এক হাজার টাকার জন্য মাশুল ৭, ১২ ও ২০ টাকা। ১ হাজার ১ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা ঋণের মাশুল ১০, ২০ ও ৩০ টাকা। ২ হাজার ১ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণের মাশুল ১৫, ৩০ ও ৫০ টাকা।

একইভাবে, ৩ হাজার ১ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা ঋণের ক্ষেত্রে মাশুল ২০, ৪০ ও ৭০ টাকা। ৫ হাজার ১ টাকা থেকে ৭ হাজার টাকা ঋণের সর্বোচ্চ মাশুল ২৫, ৫০ ও ৯০ টাকা। আর ৭ হাজার ১ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা ঋণের ক্ষেত্রে মাশুল হবে ৩৫, ৭০ ও ১৩০ টাকা। ঋণের মূল টাকা ও মাশুল যথাক্রমে ৮ম, ১৬তম বা ৩১তম দিনে পুরোপুরি পরিশোধ করতে হবে। তবে গ্রাহক চাইলে মেয়াদের আগেই মাশুলসহ ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন।

ব্যাংক অ্যাপের মাধ্যমে বিল পরিশোধের সময় গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত টাকা না থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঋণের প্রস্তাব দেওয়া হবে। গ্রাহক সম্মতি দিলে অ্যাপেই আবেদন করা যাবে। এক্ষেত্রে কাগজে স্বাক্ষরের পরিবর্তে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্মতি দিতে হবে এবং নিবন্ধিত মুঠোফোন নম্বরের মাধ্যমে পরিচয় যাচাই করা হবে। আবেদনের আগে ঋণের ধরন, পরিমাণ, মেয়াদ, মাশুল ও পরিশোধ পদ্ধতিসহ সব শর্ত পরিষ্কারভাবে জানানো হবে।

ব্যাংকগুলো চাইলে এমএফএস (MFS), পিএসপি (PSP), পিএসও (PSO) এবং অন্যান্য ফিনটেক প্রতিষ্ঠানকে এই সেবার মাধ্যম হিসেবে যুক্ত করতে পারবে, তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সব নিয়ম মানতে হবে। এছাড়া ব্যাংকগুলো নিজস্ব ডিজিটাল স্কোরিং পদ্ধতিতে গ্রাহকের ঋণযোগ্যতা যাচাই করে ঝুঁকির ভিত্তিতে ঋণের সীমা নির্ধারণ করতে পারবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, দেশে ইন্টারনেট ও ডিজিটাল যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ায় ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের প্রসার ঘটেছে, যা আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে এবং নগদ টাকার নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করছে। তবে সাময়িক অর্থসংকটে অনেকে প্রয়োজনীয় বিল পরিশোধ করতে পারেন না, ফলে সেবা বন্ধ হওয়া বা জরিমানার ঝুঁকি থাকে। এই সমস্যা মোকাবিলা এবং ডিজিটাল লেনদেনের দায়িত্বশীল ব্যবহার বাড়াতেই এই মাশুলভিত্তিক তাৎক্ষণিক ঋণ সুবিধা আনা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, বেসরকারি খাতের সিটি ব্যাংক ইতিমধ্যে বিকাশের গ্রাহকদের তাৎক্ষণিক ডিজিটাল ঋণ প্রদান করছে, যা দেশে ডিজিটাল ঋণের পরিধি বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নতুন উদ্যোগ সম্পর্কে সিটি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক অরূপ হায়দার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "ডিজিটাল বাংলাদেশ ও ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়ার উদ্যোগে নতুন এই সেবা বড় প্রভাব ফেলবে। এই সেবা চালু হলে মানুষ জরুরি প্রয়োজন মেটাবে। এই ঋণ নগদে উত্তোলন করা যাবে না, শুধু নির্দিষ্ট সেবার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে। ফলে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যবহার হবে ঋণটি। এই সেবার মাধ্যমে ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়ার উদ্যোগে নতুন যাত্রা শুরু হবে।"