ইরাক বিজয় কেবল ভৌগোলিক সম্প্রসারণ নয়, বরং প্রাচীন পারস্য সাসানীয় সাম্রাজ্যের সামরিক হুমকি মোকাবিলায় প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.)-এর কৌশলগত সিদ্ধান্ত ছিল। আরব উপদ্বীপে ধর্মীয় স্থিতিশীলতা আসার পর উত্তর ও উত্তর-পূর্ব সীমান্তে পারস্যের সম্ভাব্য আগ্রাসন প্রতিহত করতে মেসোপটেমিয়া বা ইরাককে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। তখন ইরাক ছিল শত শত বছরের প্রাচীন ও অপরাজেয় পারস্য সাসানীয় সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক হৃৎপিণ্ড। এই প্রেক্ষাপটে ইরাক অভিযান নিছক কোনো রাজ্যজয়ের তাড়না ছিল না; এটি ছিল আসন্ন বহিঃশত্রুর হুমকি রুখে দেওয়ার এক সুচিন্তিত ও দীর্ঘমেয়াদি সামরিক পদক্ষেপ।

আবু বকর (রা.) একমুখী আক্রমণ এড়িয়ে দ্বিমুখী সাঁড়াশি আক্রমণের (পিনসার মুভমেন্ট) পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এর অংশ হিসেবে দুর্ধর্ষ সমরনায়ক খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী দক্ষিণাঞ্চলে এবং আইয়াদ ইবনে গানাম (রা.)-এর নেতৃত্বে আরেকটি বাহিনী উত্তর ও উত্তর-পূর্বে অভিযান শুরু করে। (তাবারি, তারিখুর রুসুল ওয়াল মুলুক, ৩/৩৪৩, দারুল মাআরিফ, কায়রো, ১৯৬৭) উভয় বাহিনী ইরাকের অভ্যন্তরে এসে মিলিত হওয়ার লক্ষ্য রাখা হয়েছিল, যাতে পারস্য বাহিনী এককভাবে নিজের শক্তি কেন্দ্রীভূত করতে না পারে।

এই অভিযানে বনু শাইবান গোত্রের নেতা আল-মুসান্না বিন হারিসা আশ-শায়বানি (রা.)-এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি দীর্ঘদিন ধরে পারস্য সীমান্ত পর্যবেক্ষণ করে খলিফার কাছে যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তিনি মুসলিম যোদ্ধাদের সাহস জুগিয়ে বলতেন, দূর থেকে পারসিকদের যে রাজকীয় সৈন্যসমাবেশ আর ভারী ধনুক দেখা যায়, তা মূলত একটা বাহ্যিক ভয় মাত্র; তাদের সম্মুখভাগ ভেঙে দিলে কিংবা তীরের রসদ ফুরিয়ে গেলে তাদের অবস্থা হবে দিগ্বিদিক ছুটে চলা পশুর মতো। (আবু রব্বিহ সুলায়মান ইবনে মুসা আল-হিময়ারি, আল-ইকতিফা বিমা তাদাম্মানাহু মিন মাগাজি রাসুলিল্লাহ ওয়াস সালাসাতিল খুলাফা, ২/১২৭, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০০) আবু বকর (রা.) এই অভিজ্ঞতাকে মর্যাদা দিয়ে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ ইরাকে পৌঁছানোর পর মুসান্নাকে তাঁর নেতৃত্ব মেনে নিয়ে লড়াই করার নির্দেশ দেন। অহমিকা ছাড়াই মুসান্না খালিদের নির্দেশনায় নিজেকে সঁপে দেন এবং মুসলিম বাহিনীর অবিচ্ছেদ্য শক্তিতে পরিণত হন।

খালিদ ইবনে ওয়ালিদের নেতৃত্বে ইরাকের যুদ্ধক্ষেত্র দ্রুত গতিশীল হয়। প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সংঘাত ঘটে ‘জাতুস সালাসিল’ বা শেকলের যুদ্ধে। পারসিক সেনাপতি হরমুজ সৈন্যদের পায়ে শেকল পরিয়ে রেখেছিলেন, যাতে কেউ পালিয়ে না যায়। যুদ্ধের শুরুতেই খালিদ একক মল্লযুদ্ধে হরমুজকে ধরাশায়ী করেন। হরমুজের সমর্থনে ছুটে আসা গোপন পারস্য ঘাতক দলকে রুখে দেন নির্ভীক সেনানী আল-কা’কা ইবনে আমর আত-তামিমি (রা.)। সেনাপতির মৃত্যুতে পারস্য বাহিনীতে ধস নামে এবং মুসলিমরা বিপুল যুদ্ধলব্ধ সম্পদ লাভ করে।

এরপর মাজার ও উলাইজের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে একের পর এক পারসিক দুর্গ ধ্বংস হয়। বিশেষ করে উলাইজের যুদ্ধে খালিদ যে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধকৌশল প্রয়োগ করেছিলেন, তা সামরিক ইতিহাসে স্মরণীয়। সেখানে তিনি পারস্য বাহিনীর এমন একজন শীর্ষ যোদ্ধাকে দ্বৈরথে হারিয়ে দেন, যাঁকে শত্রুরা ‘হাজার যোদ্ধার সমকক্ষ’ বলে বিবেচনা করত; এরপর তিনি তার দেহের ওপর হেলান দিয়ে দুপুরের আহার গ্রহণ করেন। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬/৩৫১, দারু ইহইয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৮৮) এটি পারসিকদের দীর্ঘদিনের আভিজাত্য ও মিথ্যা অহংবোধের ওপর চরম আঘাত হানে, যা তাদের সেনাদলের মনোবলে প্রচণ্ড ফাটল ধরায়। পরবর্তীতে আল্লিস ও আমগিশিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও সামরিক ঘাঁটিতে পারসিকদের পরাজিত করা হয়। আমগিশিয়া ছিল ফোরাত নদীর মোহনায় অবস্থিত হিরার মতোই সমৃদ্ধ এক জনপদ, যুদ্ধের পর যা খালিদের নির্দেশে ভেঙে দেওয়া হয় যেন তা শত্রুর পুনর্গঠনের কাজে না লাগে। (ইয়াকুত আল-হামাবি, মুজামুল বুলদান, ১/২৫৪, দার সাদির, বৈরুত, ১৯৯৫)

একের পর এক বিজয়ের খবর মদিনায় পৌঁছালে উদ্বেলিত খলিফা আবু বকর কোরাইশদের উদ্দেশ্যে তাঁর ঐতিহাসিক মন্তব্যটি করেন, “তোমাদের সিংহ অন্য এক সিংহের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে পরাভূত করেছে; নারীরা খালিদের মতো সন্তান জন্ম দিতে অপারগ!” (মুহাম্মদ রিদা, আবু বাকার আস-সিদ্দিক: আউয়ালুল খুলাফাইর রাশিদিন, পৃষ্ঠা: ৯৪, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০১১)

খালিদ ইবনে ওয়ালিদ পারস্যের পুতুল আরব রাজ্য ‘আল-হিরা’ অভিমুখে যাত্রা করেন এবং দীর্ঘ অবরোধের পর স্থানীয় শাসকদের সঙ্গে সন্ধি চুক্তি করেন। হিরার বাসিন্দারা জিজিয়া কর দিতে সম্মত হলে তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্পদের পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া হয়। এই ন্যায়সঙ্গত আচরণে মুগ্ধ হয়ে আশপাশের স্থানীয় ভূস্বামী (দিহকান) ও গোত্রপ্রধানেরা একের পর এক মুসলিমদের সঙ্গে শান্তিশুক্তিতে আবদ্ধ হন। হিরা পরিণত হয় মুসলিম বাহিনীর রাজনৈতিক ও সামরিক কেন্দ্রে, যার প্রশাসনিক দায়িত্ব অর্পণ করা হয় আল-কা’কা ইবনে আমরের ওপর। হিরাকে সুরক্ষিত রেখে খালিদ আনবার, আইনুত তামার এবং দুমাতুল জান্দাল জয় করেন, যেখানে এসে উত্তর দিক থেকে অগ্রসর হওয়া আইয়াদ বিন গানমের বাহিনীর সঙ্গে তাঁর ঐতিহাসিক মিলন ঘটে। এরপর হুসাইদ ও মুসাইয়্যাখের সংঘর্ষেও শত্রুদের পরাজিত করা হয়। (তাবারি, তারিখুর রুসুল ওয়াল মুলুক, ৩/৩৮১, দারুল মাআরিফ, কায়রো, ১৯৬৭)

ইরাক অভিযানের চূড়ান্ত ও সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়টি রচিত হয় উত্তর সীমান্তে, যেখানে ইরাক, সিরিয়া ও ফোরাত উপত্যকা একবিন্দুতে এসে মিলেছে। ‘আল-ফিরাদ’ নামক স্থানে মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে এক অভূতপূর্ব অক্ষজোট গড়ে ওঠে। সেখানে পারসিক বাহিনী, পূর্ব রোমান (বাইজেন্টাইন) সেনাদল এবং স্থানীয় খ্রিষ্টান আরব গোত্রগুলো (তাগলিব ও ইয়াদ) খালিদ ইবনে ওয়ালিদের অগ্রযাত্রা রুখতে যৌথভাবে মাঠে নামে। ঐতিহাসিক বিশ্লেষকদের মতে, ফিরাদের যুদ্ধ সামরিক ইতিহাসে কাদিসিয়া বা ইয়ারমুকের মতো বহুল আলোচিত না হলেও কৌশলগত দিক থেকে এর গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। তিন দিক থেকে ঘিরে থাকা এই সুবিশাল যৌথ বাহিনীকে খালিদ অত্যন্ত ধূর্ত রণকৌশলে সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত করেন। এই যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ের মাধ্যমে পারস্য ও রোমানদের যৌথ প্রতিরোধ ভেঙে যায় এবং ইরাকের মাটিতে পারসিকদের ঘুরে দাঁড়ানোর মনোবল চিরতরে বিনষ্ট হয়। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি প্রত্যক্ষ করে কবি-যোদ্ধা আল-কা’কা ইবনে আমর তামিমি তাঁর কবিতায় লিখেছিলেন, “ফিরাদের প্রান্তরে আমরা মুখোমুখি হয়েছিলাম রোম ও পারস্যের বিশাল বাহিনীর... কিন্তু সংঘাত শুরু হতেই আমরা তাদের ছিন্নভিন্ন করে দিলাম, শেষ পর্যন্ত তারা খোলা প্রান্তরে মেষপালের মতো অসহায় হয়ে পড়েছিল।” (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬/৩৫৫, দারু ইহইয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৮৮)

ফিরাদের বিজয়ের মধ্য দিয়েই খালিদ ইবনে ওয়ালিদের ইরাক অভিযানের বীরত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। এরপর খলিফার জরুরি নির্দেশে তিনি সিরিয়ার ফ্রন্টে রওনা হন, যেখানে ইয়ারমুকের প্রান্তরে ইসলামের আরেক যুগান্তকারী বিজয় তাঁর অপেক্ষায় ছিল। প্রথম খলিফা আবু বকরের প্রজ্ঞাময় নেতৃত্ব, খালিদের অপরাজেয় সামরিক মনীষা এবং সাধারণ মুসলিম বাহিনীর আত্মত্যাগের মিশেলে ইরাক অভিযান কেবল ভূখণ্ড জয়ের ঘটনা ছিল না; এটি প্রাচীনকালের জীর্ণ ও অত্যাচারী সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার ভিত কাঁপিয়ে এক নতুন বৈশ্বিক শক্তির আত্মপ্রকাশের ঘোষণা দিয়েছিল।