গণভোটে ৭০ শতাংশ জনগণ সংস্কারের পক্ষে রায় দিলেও বিএনপি ক্ষমতায় এসে সেই জাতীয় আকাঙ্ক্ষার বিপক্ষে দাঁড়াচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদসহ কিছু ব্যক্তির ‘ইগোর’ কাছে হেরে যাচ্ছে গণভোট। গণভোটের বিষয়টি জনগণের এজেন্ডা থেকে জামায়াতে ইসলামীর এজেন্ডা হয়ে পড়া এবং জুলাইয়ের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে বিভাজনের কারণে সেই ‘ইগো’ বাস্তবায়িত হওয়ার পরিবেশ পেয়েছে। গণভোটের প্রশ্নটিকে জনগণের এজেন্ডার জায়গায় নিয়ে যেতে কাজ করতে হবে।

আজ শনিবার দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘গণভোট ও জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা: উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণের আলোকে গণভোটের নৈতিক ও সাংবিধানিক ভিত্তি’ শীর্ষক এক জাতীয় সেমিনারে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতা এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এ কথা বলেছেন। ‘গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরাম’ ব্যানারে যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে ভয়েস ফর রিফর্ম, মঞ্চ ২৪, আধিপত্যবাদবিরোধী নাগরিক সমাজ ও তারুণ্যের জুলাই ফাউন্ডেশন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, নির্বাচিত হওয়ার পর বিএনপি বারবার বলেছে, জুলাই সনদ তারা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু গত ছয় মাসে একটি অক্ষরও বাস্তবায়ন হয়নি। এটি জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক। জুলাই বিপ্লবের প্রতি সুবিচারের স্বার্থে সংবিধানকে নতুন রূপে প্রণয়ন করার দাবির পাশাপাশি জুলাই সনদ ও গণভোট অবশ্যই বাস্তবায়ন করার ওপর জোর দেন তিনি।

একজন ব্যক্তির ‘ইগোর’ (অহংকার বা গোয়ার্তুমি) কারণে গোটা জাতি বিপদের মুখোমুখি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তাজুল ইসলাম। কারও নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, ‘আজকে একজন ব্যক্তি গোটা সংসদের ক্ষমতা একাই এনজয় করেন। একজন ব্যক্তি বাহাত্তরের সংবিধানের বাইরে যেতে চান না। তিনি কি খালেদা জিয়ার চেয়ে বড় বিএনপি হয়ে গেছেন?’ এ ক্ষেত্রে বিরোধী দলও সংসদে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারছে না উল্লেখ করে তাজুল বলেন, একজন ব্যক্তি সংবিধান, সংবিধান বলে যে অবস্থা তৈরি করেছেন, সেটার যুক্তিপূর্ণ জবাব দিয়ে তা প্রতিষ্ঠিত করতে বিরোধী দল ব্যর্থ হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৫ এপ্রিল পর্যন্ত সামরিক সরকারের সব কর্মকাণ্ড বৈধ ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আদালত সেটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছেন। এখন জুলাই বিপ্লব–পরবর্তী সময়ে যা যা হলো, তার জন্য সরকার কী আইনি সমাধান বের করেছে?

বিএনপিকে গণভোট মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে শিশির মনির বলেন, দু–একজন ব্যক্তির ইগো এখানে কাজ করছে। এ ইগোর কাছে পুরো জাতিকে হারিয়ে দেওয়াটা ভালো বিষয় নয়। বর্তমান সরকারপ্রধানের সামনে রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার সুযোগ এসেছে। তিনি যদি দলীয় নেতাই থাকতে চান, তাহলে আর রাষ্ট্রনায়ক হতে পারবেন না।

অবশ্য সার্বিকভাবে খুব বেশি হতাশ নন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেন, জুলাই ও গণভোটকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। এটি মূলত আওয়ামী লীগের বয়ান। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জনগণ যে সার্বভৌম ক্ষমতা ফিরে পেয়েছে, সেখান থেকে তারা একচুলও নড়েনি। বর্তমান সংসদে যাঁরা আছেন, তাঁদের এটা উপলব্ধি করা উচিত। তিনি সামনে সুদিন দেখছেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

‘বার্স্টেবল সিচুয়েশনে’

সেমিনারে আলোচনায় অংশ নিয়ে আধিপত্যবাদবিরোধী নাগরিক সমাজের সদস্য ও সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী বলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতো দলগুলো দুর্নীতির ওপর চলে।

বাংলাদেশ অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে একটা চরম অধঃপতনের দিকে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন সাকিব আলী। তিনি বলেন, ‘মানুষের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। আমরা একটা বার্স্টেবল সিচুয়েশনে (বিস্ফোরণোন্মুখ অবস্থা) আছি।’

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ হাসিবউদ্দীন হোসেন আশঙ্কা প্রকাশ করেন, চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৪ সালের মতোই হবে। এর কারণ হিসেবে তাঁর ভাষ্য, ‘রাষ্ট্র দানব’। আগামী সংসদ নির্বাচন যাতে সঠিকভাবে হয়, গুম যাতে বন্ধ হয় এবং কথা বলার অধিকার যাতে প্রতিষ্ঠিত হয়—অন্তত এই তিন বিষয় নিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান হাসিবউদ্দীন হোসেন।

রাজনৈতিক প্রশ্নের সমাধান সংবিধান দিয়ে নয়; বরং রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে বলে মন্তব্য করেন এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ। তিনি বলেন, এর আগেও দুবার জনগণের সঙ্গে বিএনপি বেইমানি করে নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্বকেই হুমকির সম্মুখীন করেছিল। এবার তাদের শেষ সুযোগ।

সেমিনারে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম অল্টারনেটিভসের সংগঠক তাজনূভা জাবীন বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের কাছে সংবিধান খুবই হালকা। কিন্তু দু-তিনটা মানুষ, বিশেষত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ইগোর বিরুদ্ধে আমরা দাঁড়াতে পারছি না। এর কারণ আমাদের কালেকটিভ (যৌথ) ব্যর্থতা। সব ধরনের মানুষের সমর্থনে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল। কিন্তু গণভোটের বিষয়টা এখন জামায়াত-এনসিপির রাজনৈতিক এজেন্ডা হয়ে গেছে। এটা আর জনগণের নেই।..এ ছাড়া আমরা নিজ হাতে নানা বিভাজন তৈরি করেছি। এখান থেকে বের হতে হবে। তখন আর কারও ইগোই কাজ করবে না।’

জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সংবিধান সংস্কারের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা সংশোধনীর চেয়ে আরও মৌলিক বলে মন্তব্য করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানিম হোসেন। তিনি বলেন, ৭০ শতাংশ জনগণ গণভোটে মৌলিক সংস্কারের পক্ষে প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেট দিয়েছে, প্রথাগত সংশোধনীর কথা তারা বলেনি। জনগণের ম্যান্ডেটের চেয়ে বড় কিছু হয় না। বর্তমান সরকারের উচিত, সেই ম্যান্ডেটটাকে সম্মান করা।

আধিপত্যবাদবিরোধী নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন। ভয়েস ফর রিফর্মের নেতা ফাহিম মাশরুরের সঞ্চালনায় এতে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন মানবাধিকারকর্মী রুবি আমাতুল্লাহ, গণবিপ্লবী উদ্যোগের নেতা আরিফ সোহেল, জেডিপির আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ প্রমুখ।