বহু বছর ধরে দেশের অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। করোনা মহামারী, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত নিম্নগামী অর্থনৈতিক সূচকগুলো এর মূল কারণ। সর্বশেষ মধ্যপ্রাচ্য সংকট বা ইরান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিবেশ আরও জটিল হয়েছে। এছাড়া বাড়তি দামে জ্বালানি তেল আমদানি, লিকুইফাইড নেচারাল গ্যাস (এলএনজি) খরচ বৃদ্ধি এবং দেশি–বিদেশি ঋণ পরিশোধের বোঝা সরকারের ঘাড়ে দিনদিন ভারী হচ্ছে। ইরান যুদ্ধের আগে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ছিল ৬০ থেকে ৭০ ডলার, যা এখন বেড়ে ৯৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে প্রতি ইউনিট এলএনজি আমদানির খরচ ১০ থেকে ১২ ডলার থেকে দ্বিগুণ হয়েছে। এই সব অতিরিক্ত খরচ সামলাতে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর সুযোগ ব্যবসা-বাণিজ্যের শ্লথগতির কারণে সীমিত। তাই সরকারি ব্যয় খাত পর্যালোচনা করে খরচের অগ্রাধিকার ঠিক করা অপরিহার্য।
সম্প্রতি সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পে কমিশনের আওতাবহির্ভূত চাকরিজীবীদেরও অনুরূপ দাবি তোলের সম্ভাবনা রয়েছে। এই বেতন–ভাতা বৃদ্ধির জন্য আগামী দুই বছরে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) গত অর্থবছরের শুল্ক–কর আদায়ের ২৫ শতাংশের সমপরিমাণ এই অর্থ। প্রশ্ন হলো, সরকার নিজের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা না করেই এই বিশাল অতিরিক্ত খরচের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আজ ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কালকের বিষয় কাল দেখা যাবে—এমন মনোভাব এবং কেউ এসে বেলআউট করবে বলে আশা করাটা বাস্তবসম্মত নয়।
এ বছর এনবিআরকে লক্ষ্য অর্জনে ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে, যা বাস্তবে সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বেতন–ভাতা, জ্বালানি আমদানিসহ বাড়তি খরচ মেটাতে অর্থের জোগান কীভাবে হবে, সে বিষয়ে সরকারের নীতি নির্ধারণে ভুল পথে হাঁটা হচ্ছে। প্রতিবছর বেতন–ভাতার জন্য অন্তত ১ লাখ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে, যা চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে থাকবে। সংস্কার ছাড়া বর্তমান রাজস্ব প্রশাসন দিয়ে আদায় বাড়ানো কঠিন। আবার টাকা ছাপিয়ে বা ধারদেনা করে খরচ মেটানোও টেকসই সমাধান নয়। তাই সরকারি ব্যয় খাতগুলোর যথাযথ পর্যালোচনা করে খরচ কমানোর সুযোগগুলো কাজে লাগাতে হবে এবং অগ্রাধিকারভিত্তিক বাজেট বন্টন নিশ্চিত করতে হবে।
জাহিদ হোসেন: বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ।