পড়াশোনায় তেমন মনোযোগ না থাকলেও খেলাধুলায় তুখোড় ছিলেন দেবরাজ বণিক (২০)। স্থানীয়ভাবে ক্রিকেট খেলে নামডাকের পাশাপাশি ঘরে এনেছিলেন ডজনখানেক ট্রফি। ঘরময় সেই ট্রফিগুলো শোভা পাচ্ছে, অথচ ট্রফির মালিক আর কখনো ফিরবেন না।

দেবরাজের মৃত্যুতে পুরো বাড়িটাই শূন্য হয়ে গেছে যেন। উচ্ছল স্বভাবের এই তরুণ সারাক্ষণ মাতিয়ে রাখতেন ঘর। গত বুধবার সকালেও বের হওয়ার আগে মায়ের সঙ্গে খুনসুটি করেছেন তিনি। কিন্তু এই যাওয়াই যে শেষ যাওয়া, তা কে জানত। ওই রাতেই বাবার সঙ্গে মোটরসাইকেলে করে বাড়ি ফেরার সময় মাছ পরিবহনের পিকআপের ধাক্কায় প্রাণ হারান দেবরাজ। দুর্ঘটনায় আহত হন তাঁর বাবা আশীষ বণিকও।

দেবরাজ মিরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের দেওয়ানপুর গ্রামের বণিক পাড়ার বাসিন্দা। বুধবার রাত সাড়ে আটটায় জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের চৌধুরীরহাট এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম পুরোনো মহাসড়কে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

জোরারগঞ্জ বাজার থেকে বাংলাবাজার সড়ক ধরে এক কিলোমিটার উত্তরে গেলে দেওয়ানপুর বণিক পাড়া। ওই পাড়াতেই দেবরাজদের পাকা বাড়ি। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় সেই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় পাড়া-প্রতিবেশীর জটলা। ভেতরে আহাজারি করছিলেন মা চন্দনা বণিক ও বাবা আশীষ বণিক। মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশ। এমন মুহূর্তে চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলেন না ঘরে থাকা অন্য স্বজন প্রতিবেশীরাও।

বসার ঘরের সোফায় শুয়েছিলেন দেবরাজের বাবা আশীষ বণিক। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘খেলাধুলায় বেশি মনোযোগী হওয়ায় উচ্চমাধ্যমিকে ফলাফল খারাপ করে দেবরাজ। এর পর থেকে বারইয়ারহাট পৌর বাজারে আমার নিজের জুয়েলারি দোকানে দেবরাজ আমাকে সহযোগিতা করত। বুধবার রাত আটটার দিকে দোকান বন্ধ করে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। পথে চৌধুরীহাট এলাকায় এলে বিপরীত দিক থেকে দ্রুতগতিতে আসা একটি মাছ পরিবহনের পিকআপ আমাদের মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেয়। দুর্ঘটনায় আমরা বাবা-ছেলে দুজনেই সড়কে ছিটকে পড়ি। ঘটনাস্থলেই দেবরাজের মৃত্যু হয়। আমার ডান পায়ে কিছুটা আঘাত পেলেও তা গুরুতর নয়।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে আশীষ বণিক আরও বলেন, ‘ছেলেকে পেছনে বসিয়ে আমি মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলাম। দুর্ঘটনায় আমার তেমন কিছুই হলো না, ছেলেটা চলে গেল। আমি এখন কী নিয়ে থাকব, কাকে নিয়ে বাঁচব।’

দেবরাজের পাড়ার প্রতিবেশী রূপায়ণ কর মুক্তকণ্ঠকে বলেন, খুব হাস্যোজ্জ্বল ছিলেন দেবরাজ । খেলাধুলার প্রতি ছিল অদম্য টান। এমন এক তরুণের মৃত্যু কেউ মানতে পারছে না।

রূপায়ণ কর আরও বলেন, বুধবার রাতে দুর্ঘটনার পর বাবা ছেলে দুজনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দেবরাজকে মৃত ঘোষণা করেন। বাবা আশীষ বণিককে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাড়ি পাঠান। লাশ বাড়ি আনার পর রাত তিনটায় পারিবারিক শ্মশানে দেবরাজের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

এ বিষয়ে জোরারগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল হালিম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেওয়া পিকআপটি জব্দ করে চালককে আটক করা হয়েছে। এ বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান আছে।