পচেফস্ট্রুমের সেনওয়েস পার্ক—এ মাঠের নামটা বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে সোনার অক্ষরে খোদাই করা। ২০২০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার এই মাঠেই যে বিশ্ব জয় করেছিলেন বাংলাদেশের যুবারা! ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জিতেছিল বাংলাদেশ। সেদিন রান তাড়ায় বাংলাদেশের যুবাদের ৩ উইকেটের জয়ে কোনো অবদান রাখতে পারেননি তাওহিদ হৃদয়, ফিরেছিলেন কোনো রান না করেই।
সাড়ে ছয় বছর পর এবার সেই মাঠেই হৃদয়ের ব্যাটটা হয়ে গেল রানের ফোয়ারা। বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দলের বিপক্ষে খেললেন অপরাজিত ৩৫০ রানের ইনিংস। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের ৪৬তম সাড়ে তিন শ ছোঁয়া তাঁর এই ইনিংসটিই এখন এই সংস্করণে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের সর্বোচ্চ।
আজ ট্রিপল সেঞ্চুরি করার দিনে হৃদয় ভেঙেছেন তামিম ইকবালের অপরাজিত ৩৩৪ রানের রেকর্ডও। ২০১৯-২০ মৌসুমে বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগে (বিসিএল) পূর্বাঞ্চলের হয়ে মধ্যাঞ্চলের বিপক্ষে রেকর্ডটি গড়েছিলেন তামিম। রেকর্ড খোয়ানোর পর অবশ্য হৃদয়কে অভিনন্দন জানাতে দেরি করেননি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের বর্তমান সভাপতি। নিজের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে অভিনন্দন জানিয়ে তামিম লিখেছেন, হৃদয়ের ৩৫০ রানের ইনিংস দেশের ক্রিকেটের এগিয়ে যাওয়ার প্রতীক।
হৃদয়ের কীর্তিটা কত বড় সেটির প্রমাণ পরিসংখ্যানেই আছে। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে ট্রিপল সেঞ্চুরি করা সহজ নয় মোটেই। টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকায় দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে এই কীর্তি নেই কারও। দেশটিতে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেই বিদেশের কোনো ব্যাটসম্যানের ট্রিপল সেঞ্চুরি ছিল মোটে একটি। সংখ্যাটা কাল দ্বিগুণ হলো তাওহিদ হৃদয়ের ব্যাটে, ৭৮ বছর পর।
১৯৪৮ সালের ডিসেম্বরে প্রথম বিদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকায় ট্রিপল সেঞ্চুরি করেছিলেন কিংবদন্তি ইংলিশ ব্যাটসম্যান ডেনিস কম্পটন। পাঁচ ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলতে ১৯৪৮ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ আফ্রিকায় যায় ইংল্যান্ড দল। অক্টোবরে শুরু হওয়া সফর শেষ হয় পরের বছরের মার্চে। পাঁচটি টেস্ট ছাড়াও সফরে রাজ্য দলের বিপক্ষে ১৫টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছিল ইংলিশরা। কম্পটন ট্রিপল সেঞ্চুরি করেছিলেন প্রথম শ্রেণির এক ম্যাচেই, নর্থ ইস্টার্ন ট্রান্সভালের বিপক্ষে বেনোনিতে। প্রথম শ্রেণির ম্যাচগুলোতে অবশ্য ইংল্যান্ড নয়, কম্পটনরা খেলেছিলেন মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাব বা এমসিসি দলের ব্যানারে।
এমসিসির একমাত্র ইনিংসে ঠিক ৩০০ রান করেছিলেন কম্পটন। ৫১৫ ম্যাচের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে কম্পটনের সেটিই একমাত্র ট্রিপল সেঞ্চুরি। কম্পটনের ইনিংসের আগে-পরে ১৬৮ ও ১১৩ রানে অলআউট হয়ে ইনিংস ব্যবধানে হারে নর্থ ইস্টার্ন ট্রান্সভাল।
কম্পটনের সেই ইনিংসটাকেই আজ ছাড়িয়ে গেলেন হৃদয়। হয়ে গেলেন দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে বিদেশি ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সর্বোচ্চ ইনিংসের মালিক। ১২তম ব্যাটসম্যান হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ট্রিপল সেঞ্চুরি পাওয়া হৃদয় অপরাজিত থেকেছেন বাংলাদেশের রেকর্ড গড়ে আর দক্ষিণ আফ্রিকায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ইনিংস খেলে। ইনিংস ঘোষণা না করলে কে জানে, তিনি ৪০০ রানও পেয়ে যেতেন কিনা!
চার দিনের ম্যাচের শেষ দিনে আজ তৃতীয় সেশনে হৃদয় যখন ইনিংস ঘোষণা করেন, বাংলাদেশ ‘এ’ দলের স্কোর ৬৭৬/৮। প্রথম ইনিংসে ৫১২ রান করা দক্ষিণ আফ্রিকা দ্বিতীয় ইনিংসে ১২ ওভারে বিনা উইকেটে ১৮ রান তোলার পর ড্র মেনে নেয় দুদল। তাতে স্বাগতিকেরা দুই ম্যাচের সিরিজ জিতে নিল ১-০ ব্যবধানে। এরপর দুদল খেলবে তিন ম্যাচের এক দিনের সিরিজ, যার প্রথমটি ৬ সেপ্টেম্বর।