শুরুতেই এটা স্বীকার করে নেওয়া ভালো যে সরকারের পারফরম্যান্স মূল্যায়নের জন্য ছয় মাস কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। তবে এই লেখায় আমি যে জায়গাটার ওপরে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত রাখার চেষ্টা করব, সেটা হলো এই ছয় মাসে সরকার পরিচালনায় এমন কোনো ‘ফল্ট লাইন’ বা বড় ধরনের দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে কি না, যেটা ভবিষ্যতে বড় সমস্যার জন্ম দিতে পারে। একই সঙ্গে সরকার সমস্যাগুলো গুরুত্ব দিচ্ছে কি না কিংবা এগুলো দূর করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে কি না, সেটাও বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব।

এই বিশ্লেষণে ঢোকার আগে দুটি প্রশ্নের মীমাংসা করে নেওয়া যাক। সরকার কোন পরিস্থিতিতে এসেছে এবং সরকারের বৈধতার শক্তি কতটুকু? প্রথম প্রশ্নের উত্তর হলো, একটা ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। আমরা যদি রাজনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করি, তাহলে বলতে পারি, সরকার এমন এক অবস্থায় দায়িত্ব নিয়েছে, যখন গণতন্ত্রকে সচল রাখার জন্য যে প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যাবশ্যক, তার প্রতিটা হয় প্রচণ্ড দুর্বল অথবা এমন এক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে, যাতে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ করার সামর্থ্য ব্যাপকভাবে কমে গেছে।

সব মিলিয়ে এই তিন বড় ‘ফল্ট লাইন’ আমাদের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক যাত্রাকে গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে, এগুলো মোকাবিলার ক্ষেত্রে সরকারের একধরনের দ্বিধা, অনিচ্ছা দেখা যাচ্ছে—যার পরিণতি ভালো না–ও হতে পারে।

দ্বিতীয় বিষয়টি সরকারের জন্য বিশাল একটা সুযোগ। কেননা সরকার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে এসেছে। এটা যেকোনো সরকারের জন্যই বড় রাজনৈতিক পুঁজি। এমন বড় জনসমর্থন ও বৈধতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকারের পক্ষে এমন অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব, যেগুলো আপাতদৃষ্টে অজনপ্রিয় মনে হলেও দীর্ঘ মেয়াদে জনগণের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে। সুতরাং বর্তমান সরকারের পারফরম্যান্স মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সরকার তার রাজনৈতিক পুঁজিটা যথাযথভাবে ব্যবহার করছে কি না, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর ওপর ভিত্তি করে মূল্যায়নের তিনটি মানদণ্ড নির্ধারণ করা যায়।

প্রথমত, আমরা যখন একটা উদার গণতান্ত্রিক রূপরেখা তৈরির কথা বলি, সেটা শুধু নির্বাচনের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকে না। এখানে নির্বাচন শুধু গণতান্ত্রিক উত্তরণটাই নিশ্চিত করে। দুটি নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময়টাতে ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানগুলোকে দাঁড় করানো এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য তৈরি করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই জায়গায় সরকার কতখানি সফল হয়েছে, সেটাই বিবেচনার বিষয়।

দ্বিতীয়ত, সরকারের কাজের পদ্ধতি। সরকার যে চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হচ্ছে, সেগুলো কীভাবে মোকাবিলা করছে এবং এসব বিষয়ে জনগণের অংশগ্রহণ আছে কি না।

তৃতীয়ত, প্রতিটি রাষ্ট্রে সরকারের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হচ্ছে ধর্ম-বর্ণ-নৃতাত্ত্বিক পরিচয়-লিঙ্গনির্বিশেষে সবার জন্য কিছু মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। সেটা এই সরকার করতে পারছে কি না।

খুব স্পষ্টভাবে এই তিন জায়গাতেই বড় ধরনের দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। যদি প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের প্রসঙ্গে আসি, তাহলে আমরা খুব অদ্ভুত একটা চিত্র দেখতে পাচ্ছি। সরকারের কার্যক্রমে এমন একটা লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, যে সরকার তার নিজের ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো দাঁড় করাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের অধিকার খর্ব করার মতো শক্তিশালী হয়ে যাচ্ছে কি না, সে ব্যাপারে সরকারের কোনো মনোযোগ দেখা যাচ্ছে না।

এর অর্থ হলো সরকার একদিকে শক্তিশালী সরকার তৈরি করার পথে হাঁটছে, অন্যদিকে সেই শক্তিশালী সরকারটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান তৈরি করছে না। বরং যে প্রতিষ্ঠানগুলো আছে, সেগুলোকে দুর্বল করার দিকে সরকারের মনোযোগ বেশি।

গুম কমিশন ও মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়া এর বড় দৃষ্টান্ত। দুই ক্ষেত্রেই আমরা দেখতে পাচ্ছি, রাষ্ট্র যে নাগরিকের অধিকার কেড়ে নিতে পারবে না, সেটার ওপর সরকার একেবারেই গুরুত্ব দিচ্ছে না। সরকার বলার চেষ্টা করছে, আমাদের সদিচ্ছা আছে, সুতরাং আমরা এটা করব না। কিন্তু একটা রাষ্ট্র তো সদিচ্ছার ওপরে চলে না। রাষ্ট্রে একটি ভারসাম্যের কাঠামো তৈরি করতে হয়, যেন সরকার চাইলেও নাগরিকের অধিকার হরণ করতে না পারে।

অন্যদিকে আমলাতন্ত্রের ওপর সরকারের নির্ভরশীলতার অনেক নিদর্শন আমরা দেখতে পাচ্ছি। এর অর্থ একদিকে সরকার আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে আমলাতন্ত্র ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত ক্ষমতাশালী হয়ে গিয়ে যদি মানুষের অধিকার খর্ব করতে যায়, সেটাকে ঠেকানোর প্রক্রিয়া তৈরি করা হচ্ছে না। এটা একটা ভয়াবহ ফল্ট লাইন। কারণ, কোনো সরকারই একদিনেই কর্তৃত্ববাদী হয়ে যায় না। ধীরে ধীরে এর লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়। প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধীরে ধীরে এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে সরকার কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে। এর ফলাফলটা গিয়ে দেখা যায় সরকারের শাসনক্ষমতার শেষ দিকে, অর্থাৎ চতুর্থ বা পঞ্চম বছরে।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণ শুধু ভোট দিয়ে ‘নিষ্ক্রিয় নাগরিক’ হয়ে থাকবে, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে হলে নীতি প্রণয়নে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য এমন চ্যানেল দরকার, যার মাধ্যমে জনগণ তাদের মতামত দিতে পারবে। জনগণের অংশগ্রহণ আসলে ‘দুই দিকের যোগাযোগ’। জনগণ যেমন সরকারকে তাদের চাহিদা জানাবে, সরকারকেও তেমনি কী করছে, কেন করছে এবং কীভাবে করছে, তা জনগণকে জানাতে হবে।

দেখা যাচ্ছে, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের ক্ষেত্রে সরকার জনগণের কাছ থেকে মতামত নিচ্ছে না এবং সমস্যাগুলো সম্পর্কে জনগণকে যথেষ্ট তথ্য দিচ্ছে না। এটা আরেকটি বড় ‘ফল্ট লাইন’। কারণ, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারও যদি জনগণের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখতে না পারে, তাহলে সরকার ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। এই দূরত্ব যত বাড়বে, জনগণ তত হতাশ হবে। এর ফলে গণতন্ত্র ও কর্তৃত্ববাদের মধ্যে যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, জনগণের মধ্যেও সেই ধারণা ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে যেতে পারে। গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য এটি অত্যন্ত ভয়াবহ সংকট।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ধর্ম-বর্ণ, নৃগোষ্ঠী, পরিচয় বা লিঙ্গনির্বিশেষে সবার বেঁচে থাকার অধিকার এবং নিজ নিজ ধর্ম ও সাংস্কৃতিক চর্চা করার অধিকার রয়েছে। এই জায়গায় আমরা একধরনের ‘সামাজিক স্বৈরতন্ত্র’ তৈরি হতে দেখছি। একটি গোষ্ঠী আরেকটি গোষ্ঠীর ওপর নিজেদের মতামত জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। আর সরকারও এ ক্ষেত্রে কোনো যৌক্তিক পদক্ষেপ নিতে পারছে না।

এখানে ‘তৌহিদি জনতা’ শব্দটিকে একটি ‘আমব্রেলা টার্ম’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এর মধ্যে শুধু ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোই নেই। সম্প্রতি সাভারে একটি ওরস বন্ধের উদ্যোগে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামি, ইসলামী ঐক্যজোট ও খেলাফত মজলিসের নেতাদেরও সম্পৃক্ততা দেখা গেছে।

উদ্বেগের বিষয় হলো, ‘তৌহিদি জনতা’ যেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে একধরনের ঐকমত্যের প্রতিফলন হয়ে উঠছে। ক্ষমতাসীন দলের কেউ যদি এর অংশ হন, কিংবা দলের নেতা-কর্মীরা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেন এবং দল বা সরকার সে বিষয়ে কোনো অবস্থান না নেয়, তাহলে সবার অধিকার রক্ষায় সরকারের যে প্রতিশ্রুতি, তা বড় প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এ ক্ষেত্রে শুধু সরকারি দল নয়, সব রাজনৈতিক দলকেই তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। ‘তৌহিদি জনতা’র মধ্যে যেহেতু বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের লোকজন রয়েছেন, তাই কনসার্ট, সিনেমা প্রদর্শন বা নৌকাবাইচ বন্ধের মতো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তারা একমত কি না, তা স্পষ্ট করতে হবে। যদি একমত না হয়, তাহলে দলের নেতা-কর্মীদের এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখতে তারা কী ব্যবস্থা নিয়েছে, সেটিও জনগণের কাছে পরিষ্কার করতে হবে।

সব মিলিয়ে এই তিন বড় ‘ফল্ট লাইন’ আমাদের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক যাত্রাকে গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে, এগুলো মোকাবিলার ক্ষেত্রে সরকারের একধরনের দ্বিধা, অনিচ্ছা দেখা যাচ্ছে—যার পরিণতি ভালো না–ও হতে পারে।

আসিফ মোহাম্মদ শাহান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক

মতামত লেখকের নিজস্ব