নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে শৈলজারঞ্জন মজুমদারের জন্মভিটায় প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি এখন তালাবদ্ধ ও পরিত্যক্ত। নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা, ভূমি অধিগ্রহণে ৫ কোটি এবং সংযোগ সড়কে প্রায় ১০ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের মার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ছিল রবীন্দ্রসংগীত প্রশিক্ষণ, বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও হাওরাঞ্চলের লোকসংস্কৃতি গবেষণা ও নিয়মিত সাংস্কৃতিক আয়োজন। কিন্তু গত দুই বছরে সেখানে কোনো কার্যক্রম চলেনি। ফটকে তালা, অভ্যন্তরীণ পথ ও উন্মুক্ত স্থান আগাছায় ঢাকা, গ্রন্থাগার ও মহড়াকক্ষের ছাদ ক্ষতিগ্রস্ত, লিফট ও পাঁচটি এসি অকার্যকর, অন্তত ৫৩টি বাতি নষ্ট এবং মিলনায়তনের সরঞ্জামের অভাব। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে পাখা, চেয়ার-টেবিল, সিসিটিভি, সাউন্ড বক্স, কম্পিউটার ও বাদ্যযন্ত্রসহ বিভিন্ন সম্পদ লুট হয়েছে।

কেন্দ্রটির কর্মকাণ্ডে থমকে যাওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হলো ব্যবস্থাপনামূলক ঘাটতি ও জনবলের অভাব। ৩৪টি পদের বিপরীতে মাত্র দুজন কর্মরত থাকায় দৈনন্দিন রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। ২১ সদস্যের পরিচালনা কমিটি গঠিত থাকলেও গত তিন বছরে কোনো সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। অন্যদিকে, কেন্দ্রটির নিজস্ব তহবিলে প্রায় এক কোটি টাকা জমা রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে এখানে অর্থের সংকট নয়, বরং সদিচ্ছা ও সুশাসনের অভাবই মূল বাধা।

সরকারি অর্থায়নে নির্মিত অবকাঠামোর এই দুরবস্থা কেবল নেত্রকোনার ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর একটি পুরোনো কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন। প্রকল্পের অনুমোদন ও বাস্তবায়ন পর্যায়ের উৎসাহ ও বিপুল অর্থব্যয়ের পর শেষ ধাপে এর টেকসই পরিচালনা, জনবল নিয়োগ, রক্ষণাবেক্ষণের খরচ ও সামাজিক উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে যায়। ফলে সরকারি বিনিয়োগে তৈরি ভবনগুলো সময়ের সাথে সাথে অনাথ হয়ে পড়ে এবং প্রকল্পের সাফল্য মাপা হয় ব্যয়ের অঙ্কে, সামাজিক প্রভাবের ওপর নয়। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের আসল উদ্দেশ্য বিলীন হয়ে যাবে।

শৈলজারঞ্জন মজুমদার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি দ্রুত সংস্কার করে সচল করা জরুরি। লুট ও ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জামের পূর্ণাঙ্গ হিসাব তৈরি, ভবনের মেরামত, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও পরিচালনা কমিটিকে সক্রিয় করতে হবে। স্থানীয় শিল্পী, সাংস্কৃতিক সংগঠন, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও উৎসব আয়োজন শুরু করা সম্ভব। পঞ্চাশ কোটি টাকার একটি ভবন যদি তালাবদ্ধ থাকে, তবে প্রশ্ন জাগবেই—রাষ্ট্র কি উন্নয়ন করছে, নাকি শুধু উন্নয়নের স্থাপত্য বানাচ্ছে?