বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর বহু তরুণ বাস্তব চাকরিজীবনের সংকটে পড়েন। উচ্চশিক্ষা ও সার্টিফিকেট থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানিক কাজের অভিজ্ঞতার অভাব তাদের চাকরি খোঁজার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ‘শিক্ষানবিশ’ বা অ্যাপ্রেন্টিসশিপ ব্যবস্থা একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি নিয়মিত আয়ের সুযোগও তৈরি করে দেয়।
শিক্ষানবিশ হলো এক ধরনের প্রাক-চাকরির প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, যেখানে তরুণরা সরাসরি কাজের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করেন। নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হয়ে তারা প্রয়োজনীয় ট্রেনিং গ্রহণ করেন এবং অভিজ্ঞ কর্মীদের সাথে কাজ করে বাস্তব জগতের পরিচয় লাভ করেন। এছাড়া নির্ধারিত ট্রেনিং ইনস্টিটিউট বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিষয়ভিত্তিক তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করা হয়।
দেশে সাধারণত স্নাতক (অনার্স বা ডিগ্রি) শেষ করার পর মেধা বিকাশের জন্য এই পথ বেছে নেওয়া হয়। বর্তমানে সরকারি অফিস, আইটি ও সফটওয়্যার, ব্যাংক ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল, ই-কমার্স, ডিজিটাল বিপণন এবং বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে স্নাতকদের জন্য বিশাল শিক্ষানবিশের সুযোগ রয়েছে। শিক্ষানবিশ চলাকালে কর্মীরা নির্ধারিত ভাতা বা স্টাইপেন্ড পান। যদিও জাতীয় পর্যায়ে এর সুনির্দিষ্ট স্কেল নেই, তবুও বাজারদর অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো মানসম্মত পে-স্কেল বজায় রাখছে। স্নাতক শেষ করে নতুন সংস্থায় যোগ দিলে প্রথম বছরে মাসে সাধারণত ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকা ভাতা দেওয়া হয়। ছয় মাস থেকে এক বছরের শিক্ষানবিশ মেয়াদে সফল হলে স্থায়ী পদের সুযোগ মেলে এবং মূল বেতন মাসিক ২৫,০০০ থেকে ৪৫,০০০ টাকায় উন্নীত হয়। আইটি ও বহুজাতিক সংস্থার মতো বিশেষায়িত ও টেকনোলজি খাতে কাজের দক্ষতা বেশি থাকলে প্রাথমিক ভাতা ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
যুক্তরাজ্য বা উন্নত বিশ্বে মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই অ্যাপ্রেন্টিসশিপ শুরু হলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্নাতক বা তদূর্ধ্ব যোগ্যতাই বেশি প্রাধান্য পায়। দেশের চাহিদা অনুযায়ী এর পর্যায়গুলো বিভক্ত। ডিপ্লোমা বা লেভেল একের আওতায় স্নাতক চূড়ান্ত বর্ষের শিক্ষার্থী বা কারিগরি ডিপ্লোমাধারীরা জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট বা টেকনিশিয়ান হিসেবে যোগ দিতে পারেন। গ্র্যাজুয়েট অ্যাপ্রেন্টিসশিপে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক (বিএ, বিএসএস, বিএসসি, বিবিএ) সম্পন্ন তরুণরা অংশ নেন, যা করপোরেট এক্সিকিউটিভ বা ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি হওয়ার অন্যতম পদপ্রদর্শক। আর হায়ার ও অ্যাডভান্সড অ্যাপ্রেন্টিসশিপে ইঞ্জিনিয়ারিং, ডেটা সায়েন্স, এআই, সিএ বা লিগ্যাল ফার্মে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন তরুণরা সরাসরি উচ্চ পদে স্থায়ী চাকরির সুযোগ পান।
প্রতিবছর বাজার চাহিদা ও প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার অমিলের কারণে গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে বেকারত্বের হার বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে উচ্চশিক্ষা শেষ করেই ক্যারিয়ার গড়তে শিক্ষানবিশ একটি টেকসই বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সরকার ও বেসরকারি খাত কারিগরি প্রশিক্ষণ ও ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (এনএসডিএ) মাধ্যমে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। শিক্ষানবিশ কেবল চাকরির সুযোগই বৃদ্ধি করে না, বরং দেশের শিক্ষিত তরুণ সমাজকে সনদমুখী পড়াশোনার বাইরে গিয়ে অভিজ্ঞ ও দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে ভূমিকা রাখছে। তথ্যসূত্র: বিবিসি