ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি ছাত্রীনিবাসে রাত ১০টা পর্যন্ত চলা কঠোর কারফিউ বা ‘সান্ধ্য আইন’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞ ও ছাত্রনেতারা। ‘অবরোধবাসিনী’ নামের ছাত্রী প্ল্যাটফর্মের আওতায় রোকেয়া হলসহ বিভিন্ন হলের গেটে পোস্টার ও গ্রাফিতির মাধ্যমে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। এছাড়া আবাসিক ও অনাবাসিক ছাত্রীরা মিলে উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়ে কারফিউ শিথিল, প্রবেশপ্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং বৈধ পরিচয়পত্র দেখে যেকোনো হলে প্রবেশের সুযোগ চেয়েছেন।

এই নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়ের পর হলে ফেরত আসা ছাত্রীদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয় বা তাঁদের বাইরে আটকে রাখা হয়। তবে এই ধরনের নিয়মে গেট বন্ধ করে ছাত্রীদের অনিরাপদ করে তোলা হলে দায়িত্ব কে নেবে—তার কোনো উল্লেখ নেই। অন্যদিকে, পুরুষ ছাত্রীদের জন্য এই আইন প্রযোজ্য নয়। বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রীয় বা জনজীবনের যেকোনো স্তরে নারীদের প্রতি বৈষম্য ও লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করেছে। তাই পুরুষ ও নারী ছাত্রীদের হলে ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থা চালু রাখা সংবিধানবিরোধী।

পরিসংখ্যান বলছে, নারী শিক্ষার্থীদের সামনে কাঠামোগত বাধা রয়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৪ অনুযায়ী, পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীর ভর্তির হার ৩৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ। প্রাইমারি ও মাধ্যমিক স্তরে ভালো ফল করলেও উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনে সুযোগ কমে যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুসারে, উচ্চশিক্ষা সম্পন্নকারী পুরুষদের ৪৭ দশমিক ১৩ শতাংশ আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে নিয়োজিত থাকলেও একই যোগ্যতাসম্পন্ন নারীদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ২৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এর পেছনে রয়েছে কর্মক্ষেত্রে নারীবান্ধব সুযোগের অভাব, নিয়োগপ্রক্রিয়ার ত্রুটি, সামাজিক রীতিনীতি, পাবলিক পরিবহনের ঘাটতি, শিশু যত্ন কেন্দ্রের অস্তিত্বহীনতা এবং পরিবারে অসম কাজের বণ্টন।

সন্ধ্যার পরের সময়টি পুরুষ শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীদের জন্য সামাজিক ও পেশাদার নেটওয়ার্কিংয়ের প্রধান সময়। চায়ের দোকান, ক্যাম্পাস করিডর, টিএসসি বা রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বৈঠক—এসবই মূলত রাতের দিকে গড়ে ওঠে। ঠিক এই সময়েই ছাত্রীদের হলের গেট বন্ধ হয়ে যায়। ফলে নিয়োগ প্রতিযোগিতায় জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি ও যোগাযোগদক্ষতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নারীরা কাঠামোগতভাবে পিছিয়ে পড়েন। এটি মেধার ঘাটতি নয়, বরং সুযোগের বৈষম্যের ফল। বিবিএসের শ্রম জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশের নারী শ্রমশক্তি ২০২৩ সালের ২ কোটি ৫৩ লাখ থেকে কমে ২০২৪ সালে ২ কোটি ৩৭ লাখে নেমে এসেছে। ২০১০ সালের পর এটি প্রথম সংকোচন, যেখানে পুরুষের অংশগ্রহণ প্রায় অপরিবর্তিত। বিশ্বব্যাংক-আইএলও-এর মডেল হিসাবে নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ২০২৪ সালে ৪৪ দশমিক ১৫ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড় ৫১ শতাংশের চেয়ে কম এবং পুরুষের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। আর বিবিএসের সময় ব্যবহার জরিপ ২০২১ দেখায়, নারীরা দৈনিক গড়ে ৫ দশমিক ৯ ঘণ্টা গৃহস্থালি ও পরিচর্যা কাজ করেন, পুরুষেরা করেন মাত্র শূন্য দশমিক ৮ ঘণ্টা।

নেতৃত্বের স্তরেও এই বৈষম্য স্পষ্ট। বিভিন্ন সমীক্ষা ও বৈশ্বিক জেন্ডার গ্যাপ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ব্যবস্থাপক বা তত্ত্বাবধায়ক পদের ১০ শতাংশের কম আছেন নারী, বাকি প্রায় ৯০ শতাংশই পুরুষ। প্রবেশের আগেই নেটওয়ার্কিং ও সামাজিকীকরণের সুযোগ না পাওয়ায় নিয়োগের সময় থেকেই নারীরা এক ধাপ পিছিয়ে শুরু করেন এবং পদোন্নতির দৌড়ে এই ব্যবধান আরও বেড়ে যায়। চাকরিজীবী নারীদের ক্ষেত্রেও সন্ধ্যার পর বাইরে থাকা নিরুৎসাহিত করা হয় বা ঘরের কাজের চাপে তাঁদের ফিরতে হয়। ফলে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন তারা। এই বাধা রাজনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণকেও সীমিত করে। সংসদ বা স্থানীয় সরকারে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর আলোচনার শিকড় ক্যাম্পাস জীবনেই তৈরি হয়।

প্রশাসন কারফিউর পক্ষে যুক্তি দেন যে, রাতে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কিন্তু পরিসংখ্যান এই যুক্তিকে সমর্থন করে না। বিবিএসের সহিংসতা–বিরোধী নারী জরিপ বলছে, বিবাহিত নারীদের প্রায় ৭০ শতাংশ স্বামীর দ্বারা কোনো না কোনো ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন এবং ৫৪ শতাংশ শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই সহিংসতার প্রধান স্থান বাইরের রাস্তা নয়, নিজের ঘর। শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রেও বেশির ভাগ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি পরিবারের সদস্য বা প্রতিবেশী। তাহলে সবচেয়ে বেশি সহিংসতা ঘরের ভেতরেই ঘটে, এমন পরিস্থিতিতে নারীকে ঘরে বা হলের ভেতরে আটকে রাখাই কীভাবে নিরাপত্তার সমাধান হতে পারে?

নিরাপত্তার অর্থ নারীকে তালাবদ্ধ রাখা নয়। সড়কে পর্যাপ্ত আলো, নিয়মিত পুলিশি টহল, ক্যাম্পাস ও শহরে কার্যকর জরুরি সাড়াদান ব্যবস্থা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, সব স্তরে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে জেন্ডার শিক্ষার প্রচলন প্রয়োজন। ছাত্রীদের হলেও ছাত্রদের মতো সমান নিয়ম প্রযোজ্য হওয়া উচিত; জরুরি অবস্থায় গেট খোলার সহজ ব্যবস্থা, ডিজিটাল প্রবেশ ব্যবস্থা এবং চব্বিশ ঘণ্টা চিকিৎসা সহায়তা থাকা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিয়মিত জেন্ডার মবিলিটি অডিট করা উচিত, যেন তারা নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীদের হলে প্রবেশ–সংক্রান্ত নিয়ম, সন্ধ্যাকালীন চলাচল, পাঠাগার ও ল্যাবরেটরি ব্যবহার, পাঠ্যক্রমবহির্ভূত কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, যানবাহন ব্যবহার এবং হয়রানি বা দুর্ঘটনার সঠিক ও তুলনামূলক মূল্যায়ন করতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের এই দাবি কোনো বিচ্ছিন্ন ক্যাম্পাস সমস্যা নয়, এটি নারীর সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রশ্ন। গেট বন্ধ রাখার এই নিয়ম ভাঙা এখন সময়ের দাবি।

সাবিনা পারভীন, জেন্ডার বিশ্লেষক
তানিয়া হক, অধ্যাপক, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
*মতামত লেখকের নিজস্ব