গত রোববার দীর্ঘ এক মাসের শান্তিপূর্ণ অবস্থার অবসান ঘটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আবার হামলা চালিয়েছে। লারাক দ্বীপে অবস্থিত ইরানের রকেট উৎক্ষেপণব্যবস্থা লক্ষ্য করে এই হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। ওয়াশিংটনের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে রকেটের মাধ্যমে সামুদ্রিক মাইন স্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল ইরান, যা প্রতিরোধ করতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র এ হামলাকে ‘সীমিত ও সুনির্দিষ্ট অভিযান’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মুখপাত্র টিম হকিন্স জানান, “মার্কিন বাহিনী ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে (আইআরজিসি) সামুদ্রিক মাইন বহনকারী রকেট উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি নিতে দেখেছে।”
হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ইরানের নেতারা এটিকে আগ্রাসী পদক্ষেপ আখ্যা দিয়েছেন। পাল্টা জবাবে আইআরজিসি জর্ডানে দুটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে। আইআরজিসির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় তাদের সদস্য ও বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, এতে অন্তত দুজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী রকেটের মাধ্যমে সমুদ্রে মাইন পাতা সম্ভব কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মার্কিন নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হারলান উলম্যান বিষয়টিকে অযৌক্তিক বলেছেন। তিনি বলেন, “মার্কিন গোয়েন্দারা হয়তো গোপনে খবর পেয়েছেন যে ইরান যুদ্ধজাহাজ থেকে উৎক্ষেপণব্যবস্থার মাধ্যমে সমুদ্রে নতুন মাইন স্থাপনে প্রস্তুত। কিন্তু আন্তর্জাতিক মহলে এ হুমকিকে ছোট করে দেখাতে তাঁরা রকেটের গল্প সাজিয়েছে।” উলম্যানের মতে, রকেটের তীব্র গতির ধাক্কায় মাইন বিস্ফোরিত বা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সাগরে মাইন পাতার জন্য ইরানের কাছে অনেক ভালো উপায় ও প্রযুক্তি থাকতেও তারা কেন ঝুঁকি নিচ্ছে, তা তাঁর কাছে অদ্ভুত মনে হয়েছে।
সাধারণত বিশেষ ধরনের যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন বা উড়োজাহাজ ব্যবহার করে সাগরে মাইন পাতা হয়। এগুলো সাগরের তলদেশে বা পানির নিচে নির্দিষ্ট গভীরতায় ভাসিয়ে রাখা যায়। মাইনগুলো এমনভাবে তৈরি, যা পাশ দিয়ে কোনো জাহাজ যাওয়ার সময় তার ইঞ্জিনের কাঁপুনি বা চৌম্বকীয় সংকেত টের পেয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিস্ফোরিত হয়। বিশ্লেষকেরা ধারণা করেন, হরমুজ প্রণালিতে বিস্ফোরক ফেলার জন্য ইরান ছোট ও দ্রুতগতির যুদ্ধজাহাজ ব্যবহার করেছে, যা দ্রুত মাইন ফেলে সেখান থেকে সরে যায়। মার্কিন বাহিনী ইতিমধ্যে এরকম কয়েকটি দ্রুতগতির নৌযানে হামলা চালিয়েছে।
গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, সেন্টকম হরমুজ প্রণালিতে মাইন সরানোর কাজ শেষ করেছে। প্রণালিটি মাইনমুক্ত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। নতুন করে মাইন পাততে ব্যবহৃত জাহাজ বা নৌযান ধ্বংস করা হবে বলে ইরানকে সতর্ক করেন ট্রাম্প। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালিকে নিরাপদ করতে সেন্টকমকে অত্যন্ত ধীরগতির একটি অভিযান চালাতে হবে। প্রতিটি মাইন খুঁজে বের করে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে সেটি নিষ্ক্রিয় করতে হবে।
ইরান নিজেই এর আগে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে সমুদ্রে মাইন স্থাপনের সক্ষমতার কথা প্রচার করেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, নৌ মহড়ার সময় আইআরজিসি ফজর-৫ মাল্টিপল লঞ্চ রকেট সিস্টেম ব্যবহার করে মাইন স্থাপন করছে। সে সময় বিশ্লেষকেরা কৌশলটিকে “অভিনব” বলে উল্লেখ করেছিলেন। তবে একই সঙ্গে তাঁরা উদ্বেগও প্রকাশ করেন। কারণ, এ পদ্ধতিতে একবার রকেট ছুড়েই আইআরজিসি সমুদ্রের বিশাল এলাকায় হাজার হাজার মাইন ছড়িয়ে দিতে পারে।
১৯৯০-এর দশকে প্রথম তৈরি করা এ ফজর-৫ হলো ৩৩৩ মিলিমিটার ব্যাসের মাঝারি পাল্লার একটি রকেটব্যবস্থা। এটি সাধারণত দূরপাল্লার কামানের মতো রকেট ছোড়ার কাজে ব্যবহার করা হয়। এ রকেটব্যবস্থার মূল সুবিধা হলো, এটি একটি চলন্ত ট্রাকের ওপর বসানো থাকে। ট্রাকে থাকা উৎক্ষেপণ যন্ত্র থেকে একনাগাড়ে সর্বোচ্চ চারটি রকেট ছোড়া যায়। প্রতিটি রকেটে প্রায় ১৭৫ কেজি ওজনের প্রচণ্ড ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক থাকে। রকেটটি যখন বিস্ফোরিত হয়, তখন এর ভেতরের অংশগুলো দ্রুতগতির অসংখ্য ধারালো ধাতব টুকরায় পরিণত হয়ে চারপাশের একাধিক লক্ষ্যবস্তুকে একসঙ্গে ঝাঁঝরা করে দিতে পারে। ফজর-৫-এর পাল্লা প্রায় ৭৫ কিলোমিটার। ইরানি বাহিনী মূলত বিমানঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনায় হামলার জন্য এটি ব্যবহার করেছে। ৭৫ কিলোমিটার পাল্লা থাকায় স্থলভাগ থেকে ব্যবহার করা হলেও ফজর-৫ রকেট দিয়ে খুব সহজেই পুরো হরমুজ প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ জলসীমায় মাইন ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। পরে ইরান এ প্রযুক্তির আরও উন্নয়ন ঘটিয়েছে। ফজর-৫সি-এর মতো নতুন সংস্করণগুলোতে আরও আধুনিক ও জিপিএসভিত্তিক নির্ভুল নেভিগেশনব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। এ উন্নত রকেটগুলো এখন আগের চেয়ে দূরে—প্রায় ১৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।
ফজর-৫ বা অন্য কোনো রকেটব্যবস্থা দিয়ে ইরান বর্তমানে সমুদ্রে মাইন ছড়াচ্ছে কি না, তা দেশটি নিশ্চিত করেনি। তাত্ত্বিক দিক থেকে বিচার করলে, রকেটের মস্তকে সাধারণত যে বিস্ফোরক বা বোমা থাকে, সেই জায়গাটিতে বিস্ফোরকের বদলে সাগরে পাতার মাইন রেখে দেওয়া সম্ভব। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আইআরজিসির নৌ মহড়ায় ঠিক এমন একটি পদ্ধতিই দেখানো হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। এ ব্যবস্থায় প্রথমে সমুদ্রের উপকূলীয় স্থলভাগ থেকে ট্রাকে বসানো উৎক্ষেপণ যন্ত্র ব্যবহার করে রকেটটি ছোড়া হয়। এরপর মাইনবাহী রকেটটি সমুদ্রসীমার ওপর দিয়ে উড়ে যাবে। রকেটটি যখন নির্ধারিত সমুদ্র এলাকার আকাশে পৌঁছাবে, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে আকাশেই রকেটের ওপরের খোলস বা আবরণ খুলে যাবে। রকেটের ভেতরের অবিস্ফোরিত মাইনগুলো তখন আকাশ থেকে সরাসরি সমুদ্রের পানির দিকে পড়তে থাকবে। পানিতে পড়ার সময় মাইনগুলো যাতে তীব্র বেগে আছাড় খেয়ে নিজে নিজেই বিস্ফোরিত না হয়, সে জন্য প্রতিটি মাইনের সঙ্গে ছোট প্যারাসুট বা গতি কমানোর অন্য কোনো বিশেষ ব্যবস্থা যুক্ত থাকে। ফলে মাইনগুলো বেশ আলতোভাবে পানিতে গিয়ে পড়ে। সাগরের পানিতে পড়ার পর মাইনগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমুদ্রের একদম তলদেশে ডুবে যেতে পারে অথবা পানির নিচে নির্দিষ্ট গভীরতায় ভেসে থাকতে পারে। মার্কিন নৌবাহিনী সাধারণত মাইন অপসারণের কাজে অ্যাভেঞ্জার শ্রেণির মাইনবিধ্বংসী জাহাজ ব্যবহার করে। এগুলো তৈরিতে এমন কিছু উপাদান ব্যবহার করা হয়, যাতে এর ভেতরের চৌম্বকীয় কম্পন বা ইঞ্জিনের কাঁপুনি সাগরের পানিতে খুব একটা ছড়ায় না। ফলে সাগরের নিচে লুকিয়ে থাকা মাইন এ জাহাজের উপস্থিতি সহজে টের পায় না এবং এটি বিস্ফোরিত হওয়ার ঝুঁকিও অনেক কম থাকে।